বনলতা সেনের নাটোরে
“হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন”
আহা জীবনান্দ আহা নাটোরের বনলতা সেন।
আব্বা প্রচুর কবিতা পড়তেন। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা পাঠ করে আব্বা বেশ কয়েকবার পুরুষ্কার পেয়েছেন। জীবনান্দের ভক্ত ছিলেন আব্বা। বনলতা সেন কবিতাটা বহু বার শুনেছি পড়েছি যদিও আমি আবৃত্তির অ-জানি না। আমার ৬৪ জেলা ঘুরাঘুরি নিয়ে চিন্তা করারো আগে নাটোরের বনলতা সেনের অস্তিত্ব খুঁজার কথা ভবতাম!
জীবনানন্দ দাশ আমার কাছে প্রকৃতির অলীক কবি।
জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির এক অনন্য চিত্রশিল্পী। তাঁর কবিতায় বাংলার নদী, মাঠ, বন, আর গ্রামীন জীবন পেয়েছে জীবন্ত রূপ। রূপসী বাংলা কিংবা বনলতা সেন -এ প্রকৃতি যেন নতুন ভাষায় কথা বলে। নিস্তব্ধতা আর সৌন্দর্যের গভীরে, তিনি প্রকৃতিকে করেছেন চিরন্তন। জীবনানন্দের কবিতা পড়ি মুগ্ধ হই আবার পড়ি।
এবার সুযোগ পেয়ে গেছি বনলতাকে খোঁজার। ইমাম ভাইকে সাথে নিয়ে নাটোর পৌঁছেছি রাতে। আমাদের এক শুভাকাঙ্ক্ষী আমাদের থাকার হোটেল ঠিক করে রেখেছেন। ঢাকা – নাটোর হায়ওয়ের পাশেই হোটেল চকরামপুর দিকে। মূল শহর থেকে বাইরে। রাতে কাছের এক হোটেলে খেয়েদেয়ে রুমে ফিরে আসছি। বেশ কদিন যাবত এই অঞ্চলে ঘুরাঘুরি করে বেশ ক্লান্ত। ইদানিং নতুন রোগ হয়েছে বেশি ক্লান্ত হলে ঘুম আসে না। এপাশ উপাশ করেও ঘুম আসছে না। কাল বনলতা সেনকে খুঁজতে বের হবো এই জন্য কি না! কাল যদি সত্যি সত্যি বনলতা সেন কে পেয়ে যাই তাহলে কেমন হবে আমার অবস্থা এসব আকাশ কুসম চিন্তা করে কখন যে ঘুমিয়েছি। জেগে দেখি সকাল হয়ে গেল।
ইসলামিয়া পচুর হোটেল
জীবনানন্দ যে জেলা নিয়ে লিখে গেছেন সে জেলা নিয়ে কিছু বলতে গেলেও সাহস দরকার এতো সাহস নেই আমার। রুপ-লাবন্যে ভরপুর নাটোরে প্রথম সকাল শুরু বিখ্যাত পচুর হোটেলে খিচুড়ি দিয়ে। সাইনবোর্ডে নাম ইসলামিয়া পচুর হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। তবে নাটোরে আপামরজনতা বা পুরো দেশ চিনে এক নামে ‘পচুর হোটেল’ । নাটোরের মাদ্রাসার মোড়ের কাছাকাছি মূল সড়কের পাশেই অনেকটা জায়গা জুড়ে এই হোটেল অবস্থিত। ভেতরে ছোট-বড় কয়েকটা রুম আছে। একদম ভিতরের দু-তিনটা রুম এয়ার কন্ডিশনড। ছাদ টিনের। পচুর হোটেল সম্ভবত দিন-রাত ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে।
সবাই বলে এই হোটেলের গরুর ভুনা মাংস বেশ সুস্বাদু। ব্যাপারটা অস্বীকার করার বিষয় না। আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো ল্যাটকা খিচুড়ি আহা সরিষা তেল দিয়ে সকালে ধোঁয়া উঠা খিচুড়ি। জীবনে ঘুরতে গিয়ে খাওয়া সেরা খিচুড়ি এই পচুর হোটেলের খিচুড়ি। সরিষা তেলের গন্ধে পেট ভরে খেতে পারবেন তবে মন ভরবে না। হরেক রকমের তরকারি দিয়েও ভাত খাওয়া যায়। মিষ্টি থেকে শুরু করে সবই আছে। পচুর হোটেল থেকে বের হয়ে আমাদের বনলতা সেনকে খুঁজতে যাচ্ছি রাজবাড়িতে। নাটোর শহরে বেশ কটা রাজবাড়ি আছে তার মাঝে প্রথমটা এই মাদ্রাসা মোড় থেকেই কাছেই। হিমু পরিবহণের এক সদস্য এসেছে আমাদের গাইড হিসেবে। হোটেল থেকে মাত্র এক কিলোমিটার তবু ভ্যান নিয়ে রওনা দিলাম। আলসামী করে নয় বিলাসিতা করে।
আমাদের গন্তব্য রাণী ভবানীর বাড়ি। তৎকালীন পুঠিয়ার রাজা দর্পনারায়নের কাছ থেকে রাজা রামকান্ত ১৮০ একর বিল দান হিসেবে পান। পরে ১৭০৬-১৭১০ সালের মধ্যে তিনি রাজবাড়ী এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করেন। রাজবাড়ীটি দুই অংশে বিভক্ত: বড় তরফ ও ছোট তরফ। বড় তরফ ছিল রাণী ভবানীর মূল রাজবাড়ী।
১৭৪৮ সালে রামকান্তের মৃত্যুর পর নবাব আলীবর্দি খাঁ রাণী ভবানীর ওপর জমিদারির দায়িত্ব অর্পণ করেন। ৩২ বছর বয়সে স্বামীহারা হলেও রাণী ভবানী দক্ষতার সঙ্গে ১২ হাজার বর্গমাইলের জমিদারি পরিচালনা করেন। তার রাজত্বে নাটোর রাজ্যের আওতায় ছিল ১৬৪ পরগনা। জমিদারি থেকে বার্ষিক রাজস্ব ছিল প্রায় ১৫ লক্ষ রুপি।
পরবর্তীতে তিনি মেয়ে তারার বিয়ে দিয়ে জামাতার হাতে জমিদারি অর্পণ করেন। তবে জামাতার মৃত্যুর পর রাণী ভবানী আবার দায়িত্ব নেন। বিশাল জমিদারি থাকা সত্ত্বেও তিনি সাধারণ বিধবার মতো জীবনযাপন করতেন।
রাণী ভবানীর শাসনামলে জমিদারি রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, যশোর, কুষ্টিয়া এবং পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রজাদের কল্যাণে তিনি প্রায় ৫০ বছর দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন, যার জন্য তাকে “অর্ধবঙ্গেশ্বরী” বলা হতো।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তার রাজবাড়ীকে রাণী ভবানী কেন্দ্রীয় পার্ক হিসেবে ঘোষণা করে। রাজবাড়ীর আশেপাশের পরিবেশ চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। এখানে রয়েছে ৬টি দীঘি, যেগুলোর শান্ত জলরাশি এলাকাকে করে তুলেছে আরও মনোমুগ্ধকর। দীঘিগুলোর চারপাশে ছায়াঘন গাছপালা এবং সুনিবিড় পরিবেশ রাজবাড়ীর অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে এক অনন্য প্রকৃতির রূপ জুড়ে দেয়। বেশ কিছু সময় এইসব দিঘীর পারে গপ্প করে কাটিয়ে দেয়া যায়। এখানেই যেন বনলতা সেনের দু দন্ড শান্তি।
এছাড়া, শ্যামসুন্দর, তারকেশ্বর শিব এবং আনন্দময়ী কালিমন্দির নামে ৩টি বড় মন্দির এখনও তাদের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহ্যের কথা জানান দেয়। একসময় এখানে ধুমধাম করে পূজা-অর্চনা চলত। বর্তমানে এই স্থাপনাগুলো প্রাকৃতিক ছায়াসমৃদ্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজবাড়ী তার জৌলুস হারাচ্ছে। বেশ কিছু ভবনে উঠতে নিষেধ করা হয়েছে ছাদে উঠা যায় না। আমি গত কয়েক বছরে বেশ কিছু রাজ বাড়ি তে গিয়েছি কিন্তু জানি না কেন এটা বেশ টানছে মায়া লাগছে ছেড়ে যেতে। আরো কিছু সময় বসতে মন চাচ্ছে। প্রকৃতি মাঝে মাঝে কি কি যে করে বলা মুসকিল। নাকি বনলতা সেন এখানেই আছে!
নাটোরের বনলতা সেন যেমন বিখ্যাত তেমন নাটোরের কাচাগোল্লা জগৎ বিখ্যাত। রাণী ভবানী রাজবাড়ি পাশেই জয়কালি মন্দির। আর মন্দিরের পাশে কাচাগোল্লার আদি দোকান। কাঁচাগোল্লা নাটোরে এ উৎপত্তি হয়। তবে দেশে বিদেশে অনেক জায়গায় এটা পাওয়া গেলেও নাটোরের কাঁচাগোল্লার মত স্বাদ হয় না। ০৮ই আগস্ট ২০২৩ তারিখে দেশের ১৭ নং জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে নাটোরের কাঁচাগোল্লা।
কাঁচাগোল্লা খেয়ে আমাদের পরের গন্তব্য উত্তরা গণভবন।
মাদ্রাসা মোড় কিংবা রাজবাড়ী থেকে ৪ কিলোমিটার মত রাস্তা, অটো বা ভ্যান নিয়ে যাওয়া যায়। প্রধান ফটকে ডুকার আগেই বেশ বড় বড় নারিকেল গাছ আপনাকে স্বাগত জানাবে।
নাটোরের দিঘাপতিয়ায় অবস্থিত উত্তরা গণভবন একদিকে ইতিহাসের সাক্ষী, অন্যদিকে প্রকৃতির এক অপরূপ মিলনক্ষেত্র। ১৭৩৪ সালে দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দয়ারাম রায় ৪৩ একর জমির ওপর এটি নির্মাণ করেন। মোগল ও প্রাচ্য-প্রাশ্চাত্য স্থাপত্যের মিশ্রণে গড়া এই রাজপ্রাসাদ ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজা প্রমোদনাথ রায় এটি পুনর্নির্মাণ করেন।
দেশবিভাগের পর এটি কিছুদিন পরিত্যক্ত ছিল। পরে ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাসাদটিকে উত্তরা গণভবন ঘোষণা করেন। বর্তমানে এটি প্রধানমন্ত্রীর উত্তরের বাসভবন এবং একটি ঐতিহাসিক ও পর্যটন কেন্দ্র।
উত্তরা গণভবনের স্থাপত্য যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনি এর আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশও একইভাবে মুগ্ধ করে। প্রাসাদের চারপাশে উঁচু প্রাচীর, পরিখা, লেক, সাজানো বাগান এবং নানা প্রজাতির দুর্লভ গাছপালা রয়েছে। প্রবেশ পথেই পিরামিড আকৃতির চারতলা ফটক আর তার উপরে একটি ঘড়ি দেখা যায়, যা রাজাদের স্মৃতি ধারণ করে আছে।
ভবনের ভেতরে রাজ-অশোক, সৌরভী, কর্পূর, হরীতকী, মাধবী, তারাঝরা, নীলমণিলতা, হৈমন্তীসহ নানা গাছ প্রাসাদের চারপাশে সুনিবিড় ছায়া তৈরি করেছে। দক্ষিণ দিকের বাগানে বড় বড় গাছের সারি আর ফলের বাগান পর্যটকদের প্রশান্তি দেয়। গোলাপ বাগানের সুবাস আর সুসজ্জিত ইটালিয়ান গার্ডেন প্রাসাদের পরিবেশকে আরও মোহনীয় করে তোলে।
ছোট ছোট দীঘি ও জলাধার সবুজের সঙ্গে মিলে এক চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বট, শিমুল, আম, কাঁঠালের মতো গাছ প্রকৃতির রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে চারদিকে। সব মিলিয়ে উত্তরা গণভবন প্রকৃতি আর স্থাপত্যের এক অনন্য মিলনস্থল, যা ইতিহাস ও সৌন্দর্যের মুগ্ধতা একসঙ্গে উপহার দেয়।
নাটোরের পরের গন্তব্য চলন বিল। চলন বিলের সৌন্দর্য আলদা মহিমা তৈরি করে। চলন বিল দেখার জন্য আলদা একটা দিন রাখা উচিত যদিও একদিনে সব সৌন্দর্য দেখা সম্ভব না। তবে চলন বিল যাবার আগে নাটোরের
আরো কিছু জায়গা তে যেতে পারেন প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো বুধপাড়া কালী মন্দিরে। বনপাড়া মোড় থেকে সি এন জিতে যেতে পারেন বুধপাড়া। এ ছাড়াও লালপুর উপজেলার পানসিপাড়া গ্রামে গোসাঁই আখড়া।
নাটোরে যেতে হলে ঢাকা কল্যানপুর থেকে প্রতিদিন বাস যায় দেখেশুনে উঠে পরতে পারেন। কমলাপুর থেকে বেশ কটা ট্রেন যায় চাইলে ট্রেনেও যেতে পারেন।
আমরা গত বছর চলনবিলে গিয়েছিলাম। বর্ষা ও শীত দুবারই আপনাকে চলনবিলে আসতে হবে তাহলে রাত দিন তফাৎ দেখতে পারবেন।
চলনবিল নাটোর, নওগাঁ, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ বেশ কটা উপজেলার এলকা জুড়ে চলনবিল। বেশিরভাগ অংশ পড়েছে গুরুদাসপুর,বড়ইগ্রাম,সিংড়া চাটমোহর,তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায়। চলনবিলে কিছু অংশ সবসময় পানি থাকে বেশিরভাগ অংশ শুধু বর্ষায় প্লাবিত হয়।
চলনবিল জুড়ে বহতা রয়েছে অনেক নদী, আত্রাই করতোয়া,ইছামতি,গুড়, বড়াল, মরা বড়াল,তুলসী, ভাদাই, চিকনাই, বরনোজা ও তেলকুপি। একসময় এসব নদী সবসময় চলমান থাকতো সেই থেকে এই বিলের নাম চলন বিল রাখা হয়। পানির প্রাচুর্জতা দেখে মনে হয় সাগর। বর্ষায় ডুবোচরের মত নাক জাগানিয়া দু দশটা বাড়ি নিয়ে দ্বীপ গ্রাম জেগে থাকে। চলনবিলে অনেকগুলো বাহারি নামের বিল আছে যেমন,পিপরুল,লারোর,চলন, ঘুঘুদহ,দারিকুশি,গজনা, সোনাপাতিলা,দিক্ষিবিল, ও চিরল প্রভৃতি।
বিলের মাঝখান দিয়ে নাটোর- বগুড়া সড়ক ও ট্রেন লাইন চলে গেছে বর্ষায় সমুদ্র সাদৃশ্য পথে ট্রেন চড়ে বেশ জুইতের সময়ে বিল পার হওয়া যায়। তবে সারা বছরই নদী আর বিল দিয়ে ছোট ছোট নৌকা চলে। একসময় মহিষাজোঁক থাকতো প্রচুর। ধীরে ধীরে বিলের জীব বৈচিত্র হ্রাস পাচ্ছে। বিলে সব ধরনের দেশী মাছ পাওয়া যায়, বর্ষার পানি কমতে থাকলে মাছ ধরা বৃদ্ধি পায়। বেরজাল দিয়ে ছোট ছোট দল পুরো বিল জুড়ে মাছ ধরে বর্ষার প্রতিটি দিন। তবে বর্ষা শেষে শুকনো মৌসুমে পানির সাথে মাছ কমে যায়। চলন বিলে মুক্তা হলো বড় আর্কষন একসময় প্রচুর মুক্তা পাওয়া যেত বাহারি নামের, শ্বেতী,চুমকি, গ্যাঁরা, চুর, মোতি,চন্দ্রিকা,প্রভৃতি।
বর্ষায় পুরো বিল জুড়ে ছোট ছোট নৌকা করে জেলেরা মাছ ধরতে যায়, ঢেউয়ের তালে তালে হাঁস ভেসে বেড়ায় ছোট ছোট মাছ ও শামুক খাওয়ার হিরিক পরে তাদের। প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠে বিল নির্ভর।
তবে আমার কাছে হাওর কিংবা বিল পাড়ের জীবন বর্ষা থেকে শীতে বেশি সুন্দর মনে হয়। বর্ষায় চলনবিল পানিতে থই-থই হলেও, শীতকালে বিস্তৃত প্রান্তরে ফুটে উঠে কৃষকের হাঁসি। ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে কর্মব্যাস্ততা বেড়ে যায় গরু নিয়ে মাঠে মাঠে হাল চাষ, কিংবা আধুনিক মেশিনে জমি চাষের সময় পিছনে বক,শামুকখোল সহো বিভিন্ন ধরেন পাখিদের আনাগোনা দেখতে মন্দ লাগে না।
শীতে চলন বিলে প্রচুর অতিথি পাখি আসে। পাখিদের আনাগোনা তে মুখরিত থাকে পুরো বিল। কৃষকের মুখে হাসি ফোটে জমি চাষ করে ফসল তুলে ঘরে নেয়ার সময়। সারাদিন জমিতে পরিশ্রম করেও তখন মুখ ভর্তি হাসি থাকে এ জন্যই আমার কাছে বর্ষা থেকে শীত জুইত লাগে। ইদানিং বেশি চাষ হয় সরিষা। হলুদের সমারুহে অপরুপ সাজে সেজে থাকে চলন বিল। যতদূর চোখ যায় হলুদ আর হলুদ। চলন বিলের সরিষা ফুলের ক্ষেত যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। চারদিকে ছড়ানো বিলের অসীম প্রান্তর যখন শীতের হিমেল বাতাসে সরিষার হলুদ ফুলে ভরে যায়। তখন মনে হয় যেন পুরো প্রকৃতি সোনার চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে আছে।
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যখন সূর্যের নরম আলো ধীরে ধীরে সরিষার ক্ষেত ছুঁয়ে যায়, তখন পুরো দৃশ্যটি হয়ে ওঠে মায়াবী। হলুদ ফুলগুলো যেন সূর্যালোকে জ্বলজ্বল করে ওঠে, আর চারপাশের সবুজ পাতার সাথে মিশে এক মোহনীয় রঙের খেলা সৃষ্টি করে। সেই আলো-ছায়ার খেলায় ক্ষণের জন্য হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।সরিষা ফুলের ক্ষেত শুধু দেখার জন্য নয়; এর গন্ধও মুগ্ধ করে। সরিষার হালকা মিষ্টি গন্ধ বাতাসে মিশে এক ধরনের সজীবতা এনে দেয়। এই গন্ধের সাথে মধু সংগ্রহ করতে আসা মৌমাছিদের ব্যস্ত গুঞ্জন এবং পাখিদের কিচিরমিচির যেন জীবনের স্পন্দন বয়ে আনে।
চলন বিলে শুকনা মৌসুমে ধান, পেয়াজ বিভিন্ন রকমের ফসল চাষ হয়। ইদানিং ফটোগ্রাফার দের বেশ পছন্দের জায়গা পরিনত হয়েছে
শীতকালের সকালে কুয়াশার চাদর যখন ধীরে ধীরে সরতে থাকে, তখন দেখা যায় কৃষকেরা লাঙ্গল কাঁধে বা গরুর গাড়ি নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে। কেউ মাটিতে নেমে ফসলের অবস্থা দেখছেন, কেউ আবার সেচের নালা ঠিক করছেন। চারপাশে শিশির ভেজা ফসলের পাতা আর জমিতে ধীরে ধীরে কাজ শুরু করা মানুষদের কোলাহল যেন এক নিজস্ব সুর তৈরি করে।
জীবনানন্দ এইসব দৃশ্য কবিতা মত লিখে গেছেন আমাদের জন্য বার বার ফিরার জন্য। আমারো কবির মতো রুপসি বাংলার মাঠে, নদীতে কিংবা নবান্নে ফিরতে ইচ্ছে করে। চোখে ভেসে উঠে কবির লাইন।
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে—এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়,—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়;
হয়তো বা হাঁস হ’ব—কিশোরীর—ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,
সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে;
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়;
হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;
রূপ্সার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা বায়;—রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক: আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে
























