ফাল্গুন আকাশ অন্ধকারে নিবিড় হ’য়ে উঠছে।
মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা
সেই নগরীর এক ধূসর প্রাসাদের রূপ জাগে হৃদয়ে।
ভারত সমুদ্রের তীরে কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে
অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে।
আজ নেই, কোনো এক নগরী ছিলো একদিন কোনো এক প্রাসাদ ছিলো।
মূল্যবান আসবাবপত্রে ভরা এক প্রাসাদ।
পারস্যগালিচা, কাশ্মীরী শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল।
আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা।
আর তুমি নারী–
এইসব ছিলো সেই জগতে একদিন।
জীবনানন্দের এই কবিতার লাইন গুলো হঠাৎ খুব করে
মনে পড়ছে গত কয়েকদিন যাবত ধূসর প্রাসাদের রূপ হৃদয়ে জাগিয়ে বেড়াচ্ছি। হাজার হাজার বছর পূর্বের নগরীর রুপ। আমি সবসময় সক্রেটিসের সুন্দর জীবন চেয়েছিলাম, যে জীবনে থাকবে হাজার বছরের বিলুপ্ত নগরী, ধূসর প্রাসাদের ছায়া, সিন্ধু পারে সভ্যতা।
আমার কাছে মনে হয় মানুষের জীবন পুরোটাই ইসিজির রিপোর্টের মত! এই উপরে এই নিচে । এসব আকাশ পাতল চিন্তা করতে করতে ফাল্গুনের সন্ধ্যায় বগুড়া এসে পৌছেছি। বগুড়ায় এতো পরিমাণ পরিচিত মানুষজন। শুধু পরিচিত বললে ভুল হবে বরং আপন মানুষজন বললেই ভালো হয়।
সংগঠনে কাজ করার সুবাদে সবার সাথে পরিচয়। মুরাদ ভাইয়ের বাড়ি বগুড়া আর বাকি সবাই মুরাদ ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয়। এখন রক্তের সম্পর্কের মত হয়ে গেছে। বগুড়া পৌছে হোটেল কিংবা ডাকবাংলোতে থাকার কথা চিন্তা করতে পারি নি! রাতে তালাশ ভাইয়ের বাসা ঠিকানা। তালাশ ভাই জুইতের মানুষ এক জীবনে মনে হয় হাজার তিনেক বই পড়েছে, বই পোকা বলা যায়।

বগুড়া জুইতের শহর, উত্তরে ঢুকতে হলে বগুড়া হয়ে ঢুকতে হবে। এই অঞ্চলের সবথেকে উন্নত শহর বগুড়া শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প সব মিলে বেশ আধুনিক। ঢাকা থেকে বাস ও রেলপথ চালু আছে অল্প সময়ে আসা যায়। বাসের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগে ট্রেনে। শহরে সাতমাথা এলাকার কাছাকাছি অনেকগুলো হোটেল আছে চাইলে থাকতে পারবেন।

দইয়ের শহরে পৌছার পর আমাদের প্রথম গন্তব্য “এশিয়া সুইটস” এর দই। বগুড়ার দই দেশ-বিদেশে খুবই বিখ্যাত। স্বাদ এবং বানানোর প্রক্রিয়া অনন্য এক মাত্রায় তুলে দিয়েছে এই দইকে। কদিন আগেই জি আই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বগুড়ার দই। সাতমাথা বগুড়ার প্রাণকেন্দ্র তার কাছাকাছিই ওগুলো এশিয়া, শ্যামলী, চিনিপাতা, আকবরিয়া আরো অনেক দই মিষ্টির দোকান রয়েছে । সাতমাথা কেন্দ্রিক কিছু অফিস আদালত ও শহীদ খোকন পার্ক রয়েছে। বিকেল বা সন্ধ্যায় বসে আড্ডা দেয়ার মত জায়গা হলো শহীদ খোকন পার্ক এবং আশ-পাশের চায়ের দোকান । তাছাড়া চাইলেই এডওয়ার্ড পার্কেও আড্ডা দেওয়া যায় , এটিও সাতমাথাতেই বলা চলে । সাতমাথা কেন্দ্রিক চা আর ভাজাপোড়া দোকান দিয়ে চারদিক ঘেরা আড্ডা জমানোর সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে এইখানে।

সরকারি আজিজুল হক কলেজের পাশেই আমাদের রাত্রিযাপন। শহরের কোলাহল পেরিয়ে আজিজুল হক কলেজ একখণ্ড সবুজের সমারোহ । নিশ্চুপ পরিবেশের মধ্যে দিয়েই পৌঁছানো গেলো গন্তব্যে । ফেব্রুয়ারি মাস উত্তরের এই শহরে ঠান্ডা বেশ আছেই । বেশ উপভোগ্য ঠান্ডা। আজ অনেকগুলো মানুষ , সবাই খাটের উপর আর ফ্লোরে থেকে রাত্রিটা বেশ আনন্দেই কাটলো । এক্ষেত্রে ঠান্ডা এই আবহাওয়া বেশ ভুমিকা পালন করলো। অনেক দিন পর নিজেদের মানুষ পেয়ে রাত্রিটা বেশ আনন্দে কাটলো।

পর দিন আমাদের গন্তব্য সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী মহাস্থানগড়। মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। যিশুখ্রিষ্টের জন্মেরও আগে অর্থাৎ প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল, প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে। ২০১৬ সালে এটিকে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সকালে লিংকন ভাই আর রিজভী ভাই যুক্ত হয়েছেন। এক ফাঁকে দ্যা রাজিত দা আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছেন রাজিত ভাই একজন মিস্ট্রি। এবার আর দেখা হয় নি আমাদের সবার গুরু সেলিম ভাইয়ের সাথে এই একজন মানুষের জন্যই সবাই একসাথে পরিচয়।সবাই বেশ বই পড়ুয়া মানুষ। পড়াশুনা মঞ্চ নাটক ও ঘুরাঘুরিতে জুইতের মানুষ বলা যায়। সকালে বিখ্যাত হোটেল আকবরিয়াতে নাস্তা করে বের হয়েছি আমরা। রাতে কিংবা সকালে বগুড়া পৌছে হোটেল আকবরিয়াতে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে বগুড়া দর্শনে বের হতে পারবেন।

সাতমাথা থেকে সি এন জি যায় মহাস্থানগড়ের বাজারে সেখান থেকে হাঁটা পথ। একসাথে অনেকগুলো ঐতিহাসিক জায়গা এই পুরাকীর্তির মহাস্থানগড়ে।
মহাস্থানগড়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান এবং এখানকার শুরতেই হলো গোকুল মেধ স্থানীয়ভাবে এটাকে বেহুলা – লক্ষীন্দরের বাসর ঘর বলে। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাং তাদের ভ্রমণ কাহিনীতে এটাকে একটি বৌদ্ধ মঠ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এতে ১৭২টি ত্রিকোণ কক্ষ রয়েছে, যার এলোমেলো নির্মাণশৈলী এর রহস্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বর্ষার শেষে এই মঠের সবুজ ঘাস অন্যরকম সৌন্দর্য প্রকাশ করে ।

বাসর ঘর না হলেও এর পশ্চিম অংশে বাসর ঘরের প্রবাদসংক্রান্ত স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। এর পূর্ব অংশে রয়েছে ২৪ কোণা বিশিষ্ট চৌবাচ্চার মতো একটি স্নানাগার, যার মধ্যে ৮ ফুট গভীর একটি কূপ ছিল। সকালের নরম আলোয় বেশ খানিকটা সময় পার করলাম এই ইতিহাসের ক্ষয়ে যাওয়া চিহ্নের সাথে ।
মহাস্থানগড় বাসস্ট্যান্ড থেকে পায়ে হাঁটা পথ “মাহী সওয়ার মাজার শরীফ” প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই মাজারে আসেন। শুরুতেই বোরহানউদ্দীনের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে সামনের দিকে এগোনো যায় । প্রতি বছরের বৈশাখ মাসের শেষ তারিখে এখানে বৈশাখী মেলা হয়। মাজার থেকে হাঁটা পথ পরেই খোদার পাথর ভিটা, মানকালীর কুন্ড , দুর্গে ঢোকার সদর দরজা, জিয়ৎ কুণ্ড। এ যেন মহাকালের পথে হাঁটা। এখন একটা জমির ধার ধরে হাটছি অথচ কয়েকশত বছর আগেও ছিলো জাক জমক একটা নগরী । যেখানে উজির-নাজির, ঘোড়া গাড়ি , প্রজা আর যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ঝলমল করতো এই করতোয়া পার । আজ শুধু ইতিহাসের অংশ হবার দিন ।
ইতিহাসবিদদের ধারণা, জিয়ৎ কুন্ড এটি রাজা পরশুরামের শাসনামলে খনন করা হয়েছিল।সম্ভবত ১৮-১৯শতকের মাঝামাঝি সময়ে পরশুরাম প্রাসাদের নির্মাণের সময়। স্থানীয় জনগণের পানির অভাব মেটাতে কূপটি খনন করা হয়।
কূপটির কাছেই পরশুরামের প্রাসাদ। এটি মহাস্থানগড়ের সীমানা প্রাচীরের ভিতরে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। স্থানীয়ভাবে এটিকে ‘হিন্দু নৃপতি পরশুরামের প্যালেস’ বলা হয়।
বহুদিন পর কোন রকম তাড়া ছাড়াই ঘুরছি আজ। তালাশ ভাই আর লিংকন ভাইয়ের মুখে ইতিহাস শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে হাজার হাজার বছর পূর্বের মহাস্থানগড়েই হাঁটছি। আমাদের পরের গন্তব্যে ভ্যান না নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। করতোয়ার তীর ধরে গোবিন্দ ভিটার পথে, চাইলে জিয়ৎ কুণ্ডু থেকে একটু নিচে নামলেই, ভ্যানে বা অটোতে যেতে পারেন মিনেট দশেকের পথ। তবে এই পুন্ড্রনগরের প্রাচীর ধরে হাঁটার মধ্যে বেশ একটা ভালোলাগা কাজ করে। নানান ফসলের জমি দেখতে দেখতে সামনে দিকে এগিয়ে চলছি আমরা ।
করতোয়া নদীর তীরে মহাস্থান দুর্গের নিকটে অবস্থিত একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান গোবিন্দ ভিটা। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। গোবিন্দ ভিটা নামটি হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর আবাস নির্দেশ করে, কিন্তু এখানে বৈষ্ণব ধর্মের কোনও নিদর্শন পাওয়া যায়নি।
গোবিন্দ ভিটার একদম সামনেই মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। জাদুঘরটি ১৯৬৭ সালে করতোয়া নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মহাস্থানগড়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে। জাদুঘরে মৌর্য, গুপ্ত ও পাল রাজবংশের প্রাচীন নিদর্শনসহ সোনা, রূপা, ব্রোঞ্জ, পোড়ামাটির মূর্তি এবং অলংকার সংরক্ষিত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের পোড়ামাটির মূর্তি, ১৫০০ শতকের আরবি শিলালিপি এবং বিভিন্ন শতকের ব্রোঞ্জের মূর্তি। এ ছাড়াও এটিকে উত্তরাঞ্চলের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত করা হয়। রবি ও সোমবার সকালে জাদুঘরটি বন্ধ থাকে এবং প্রতিদিন সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত মধ্যাহ্ন বিরতি।
মহাস্থানের পরতে পরতে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনা চাপা পরে আছে পুরো ইতিহাস ঘেটে কিংবা জেনে যদি এই জায়গাগুলো তে যান তাহলে দেখে আরাম পাবেন। একটা জায়গার গল্প জানা ছাড়া সে জায়গাটা লবনহীন তরকারির মত মনে হয় আমার কাছে।মহাস্থানগড় থেকে খুব কাছেই , করতোয়া নদীর তীরে শীলাদেবীর ঘাট।
স্থানীয় কাহিনী অনুযায়ী, শীলাদেবী ছিলেন মহাস্থানগড়ের শেষ হিন্দু রাজা পরশুরামের বোন বা ভগ্নি। মুসলিম সাধক শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ার কর্তৃক রাজা পরশুরাম পরাজিত হবার পর শীলাদেবী করতোয়া নদীর এই স্থানে জলে ডুবে আত্মহুতি দেন। এরপর থেকে স্থানীয় হিন্দুধর্মালম্বীরা এই স্থানে প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা দশমীতে এবং ১২ বছর পরপর পৌষ-নারায়ণী স্নানের উদ্দেশ্যে এই স্থানে যোগ দিয়ে থাকেন। দেশে এবং দেশের বাইরের অনেকেই এই স্নান উৎসবে অংশ নিতে করতোয়া তীরে আসেন। অন্য এক জনশ্রুতির মতে, স্থানটি এক সময় নৌ-পথে আমদানি করা পাথর খালাস ও স্তুপীকৃত করে রাখার জন্যে ব্যবহৃত হতো বলে কালক্রমে এর নাম হয় “শিলা দ্বীপ”, এবং যার বিকৃতরূপ সম্ভবত “শীলাদেবী” এবং “শীলাদেবীর ঘাট”।
মহাস্থানগড় বাজার থেকে ভ্যানে যেতে পারেন ভাসু বিহারে।
ভাসুবিহার স্থানীয়ভাবে পরিচিত নরপতীর ধাপ নামে। এর অবস্থান শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার হাটে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে এখানে এসেছিলেন। তার ভ্রমণবিবরণীতে তিনি এটাকে ‘পো-শি-পো’ বা বিশ্ববিহার নামে উল্লেখ করেছেন। খুব সম্ভবত এটি বৌদ্ধদের ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ব্রিটিশ আমলে ভাসুবিহারকে স্থানীয় মানুষরা ‘ভুশ্বুবিহার’ নামে আখ্যায়িত করেছে। ভাসু বিহারকে বৌদ্ধ সংঘারামের ধ্বংসাবসেস হিসেবে মনে করা হয় । এক সময় হিমালয় আর তিব্বত থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এখানে আসতেন দীক্ষা নিতে । এমনকি উত্তরের এই জনপদে ছড়ানো -ছিটানো অনেক বিহার আমাদের চোখে পরে ।
হলুদ বিহার, সোমপুর বিহার , জগদ্দল বিহার উল্লেখযোগ্য । তবে অনেকেই বলেন যে, নালন্দার পরে এই ভাসু বিহারই ইতিহাসের দ্বিতীয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় । এর সবুজ ঘাসে শুয়ে থেকে ইতিহাসের সেই মানুষ গুলোকে কল্পনা করা যায় অনায়াসে। যারা দলে দলে হিমালয় থেকে নেমে আসছে এই ভুমিতে , দীক্ষা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে হিমালয়ের কোলে , কিংবা ছড়িয়ে পরছে নানান জায়গায়।
বগুড়া ইতিহাস ঐতিহ্য ভরপুর একদিন ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। দুপুরে মহাস্থানগড় বাজারে খেয়ে আরো বেশ কিছু ঐতিহাসিক জায়গা দেখতে পারেন কালীদহ সাগর, বৈরাগীর ভিটা, ভীমের জঙ্গল সবগুলো মহাস্থানগড়ের আশেপাশেই। এই শিবগঞ্জ উপজেলাতেই এতো কিছু চিন্তা করা দুরুহ তাই হয়তো সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী করা হয়েছে। মহাস্থানগড় ঘুরা শেষে এখানকার বিখ্যাত চালের কটকটি খেতে পারেন।

আজকে শিবগঞ্জেই আমাদের রাত্রিযাপন লিংকন ভায়ের বাসায়। দো’তলা বাড়ি চারদিকে বৃক্ষরাজির ছায়া ছাদে কবুতরের নিবাস। আন্টি না থাকায় ইচ্ছেমত আড্ডা চলছে। লিংকন ভাই প্রচুর কবুতর পোষেন । এক ছাদে কবুতর আরেক ছাদে ফুল আর ফলে ভরপুর । রাতের একটা অংশ এই ফুলের মাঝেই কাটানো যায় । দুপুরে এবং রাতের খাবারে আন্টির রান্না করা কবুতরের মাংস দিয়ে আমাদের চলছে। বিদেশ বিভুয়ে নিজের মানুষ পেলে আত্মা শান্তি পায়, গত বেশ কয়েকদিন যাবত এই অঞ্চলে এসে ক্লান্ত লাগছিল।আজকে কেমন জানি সব কিছু শান্তি লাগছে। নিজেদের মানুষ থাকায় রাতভর আড্ডা আর শিবগঞ্জে ঘুরাঘুরি করে এক মহাকাশ শান্তি নিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছি।

বসন্তের কেবল শুরু! বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলে শীত বসন্তে প্রচুর মেলা হয় মেলা মানেই মিলন। মানুষের মিলন গ্রামের সব মানুষের একসাথে হবার আয়োজন। ইদানিং মেলা আর আগের মত জৌলুস নেই পুরোপুরি ব্যবসাবান্ধব হয়ে গেছে। বগুড়ায় ভাগ্য এতো সু-প্রসন্ন হবে ভাবতে পারিনি। বিখ্যাত পোড়াদহের মেলা চলছে বগুড়ায়।

ঐতিহাসিক পোড়াদহ মেলা শুরুর সঠিক সাল জানা যায় নি। তবে ধারনা করা হয় বর্তমান সময় থেকে প্রায় চারশত কিংবা তারচেয়েও বেশি বছর পূর্বে কোন এক সময়ে মেলা সংগঠনের স্থানে একটি বট গাছ ছিল। একদিন হঠাৎ করে সেখানে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হয়। তারপর সেখানে দলে দলে সন্ন্যাসীরা এসে একটি আশ্রম তৈরি করেন। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে সেটি একটি পূণ্য স্থানে পরিণত হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সেখানে প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষ দিনের পরের বুধবার সন্ন্যাসী পূজার আয়োজন করে।
দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা প্রতি বছর সেই দিনটিতে এসে সমাগত হতে থাকে। দিন গড়ানোর সাথে সাথে প্রতিবছর লোকসমাগম বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে পূজার দিনটিতে একটি গ্রাম্য মেলার গোড়াপত্তন হয়। এক সময় সন্ন্যাসীরা স্থানটি ত্যাগ করে চলে গেলেও সন্ন্যাসী পূজাটি অব্যাহত থাকে। ধীরে ধীরে মেলাটির পরিচিতি বাড়তে থাকে এবং দূর-দূরান্ত থেকে মেলা দেখতে লোকজন আসে। মেলাটি ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে সব ধর্মের মানুষকে উৎসবে একত্র করে এবং এখন পর্যন্ত এটি সকল ধর্মের হাজার হাজার মানুষের এক বিশাল জনসমাগম করায়।

সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে মেলাটি শুরু হয়েছিল তাই এর নাম প্রথম অবস্থায় ছিল সন্ন্যাসী মেলা। মেলাটি পোড়াদহ নামক জায়গায় বলে লোক মুখে স্থানের নাম অনুসারে “পোড়াদহর মেলা” হিসাবে চলতে চলতে এক সময় এর নাম “পোড়াদহ মেলা” হিসাবে প্রচলিত হয়ে যায়। মেলা উপলক্ষে আশেপাশের গ্রামের যেসব মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে তারা জামাই নিয়ে বাপের বাড়িতে হাজির হয় বলে অনেকে একে জামাই মেলা হিসেবেও সম্বোধন করেন। আবার মেলায় বড় বড় হরেক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় বলে একে মাছের মেলা বলে। বিভিন্ন জন বিভিন্ন নামে সম্বোধন করলেও এটি মূলত “পোড়াদহ মেলা” নামেই সবার কাছে পরিচিত। মেলায় বিশালকার মিষ্টি আনা হয় সু-স্বাদু সব মিষ্টি।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিখ্যাত উপন্যাস “খোয়াবনামায়” এই মেলা এবং এই জনপদের বেশ উল্লেখ আছে ।
আর পাঁচটা মেলার মতই সব কিছুর পাশাপাশি বৃহৎকার মাছ উঠে বেশি মেলার কয়েকমাস আগে থেকেই জেলেরা বড় মাছ গুলো সংগ্রহ করে রাখে মেলায় বিক্রি করবে বলে। মেলার সময় আশেপাশে গ্রামগুলোতে পারিবারিক মিলনমেলা বসে। এই মেলায় সবসময় আনন্দ থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে আমার কাছে বেশ অদ্ভুত ও জঠিল মনে হয়েছে। জামাই আসলে শশুর মাছ কিনতে হয় যত বড় মাছ তত বড় সম্মান। একদম নিম্ন বিত্ত পরিবারের যখন বড় বড় মাছ কিনতে হয় জামাই কিংবা শশুরবাড়ির জন্য তখন বেশ বেগ পেতে হয় তবু নিয়ম রক্ষার্থে কিনে অনেকে।
পোড়াদহ মেলা ঘুরে পরদিন ঢাকায় চলে আসি। এর পর আরো বেশ কয়েকবার বগুড়া যাওয়া হয়েছে। শেষবার যখন গেলাম মুরাদ ভায়ের বাড়িতে সারিয়াকান্দি। যমুনা আর বাঙালী নদীর মাঝে সারিয়াকান্দি উপজেলা। মেলার সময় ছাড়া গেলে বগুড়ায় মহাস্থানগড় এবং আশপাশ দেখে পরদিন সারিয়াকান্দি উপজেলায় ঘুরে বগুড়া শহরে ফিরে দই নিয়ে ঢাকায় কিংবা নিজের গন্তব্যে ফিরতে পারেন।

বগুড়ার যমুনার তীরবর্তী উপজেলা সারিয়াকান্দি। নদী-বিধৌত সারিয়াকান্দির মানুষদের সুখ-দুঃখ একটাই, তা হলো যমুনা। যমুনার পাড় ঘেঁষে ছোট্ট একটা উপজেলা সারিয়াকান্দি। ছোট ছোট চর ও মরিচের আবাদ সমৃদ্ধ করেছে উপজেলাটিতে।
বাঙালী নদীর পাশেই ছায়া ঘেরা গ্রামে মুরাদ ভায়ের বাড়ি। বাড়ির সামনে পুকুর তার সামনে বিশাল ফসলি মাঠ। অতীতের বড় গৃহস্থ বাড়ির পরিচয় পাওয়া যায়। বাড়ির সবার সাথে আগে থেকে পরিচয় থাকার ফলে নিজের বাড়ির মতই চলছে যমুনা আর বাঙা্লী নদীর মাছের স্বাদ।

আমার শুধু ভালো মানুষের সাথে পরিচয়। ঢাকায় যাবার পর যত মানুষের সাথে পরিচয় তার বেশিরভাগই মুরাদ ভায়ের মাধ্যমে।
সারিয়াকান্দি তে যমুনার তীরে দুটি ঘাট আছে কালিতলা আর প্রেম যমুনার ঘাট মূলত নদী রক্ষা বাঁধ দেয়ার পরই এগুলা পর্যটন মুখর হয়ে উঠেছে। মুরাদ ভাইয়ের সাথে আমার গন্তব্য সেখানেই আজ বগুড়া (চেলোপাড়া ব্রিজ) থেকে সি এন জি তে সারিয়াকান্দি সেখান থেকে ভ্যান বা অটো নিয়ে গ্রোয়েন বাঁধ বা কালিতলা ঘাট কিংবা প্রেম যমুনার ঘাট সবই এক নাম যেতে পারেন। বিকালটা দারুণ কাটবে এখানে।

নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগ, জেলেদের নদীতে মাছ ধরা, ছোট বড় ইঞ্জিন চালিত ও ইঞ্জিন ছাড়া নৌকা, ট্রলার স্পিড বোট দেখতে দেখতে হেলে পড়ে সূর্য। উপভোগ করতে পারেন নদীপাড়ের অপার সৌন্দর্য, চোখে পড়বে শত শত হাত লম্বা জাল দিয়ে মাছ ধরা। চড়তে পারেন ছোট ছোট নৌকায়। দুপুরে আসলে যমুনার তাজা মাছ হরেক পদের রান্না দিয়ে খেতে পারেন।

যমুনা পার হলেই জামালপুর উপজেলা। অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল সমুদ্র সাদৃশ্য যমুনার উপর ট্রলার দিয়ে পারি দেয়া। পরের দিন মুরাদ ভায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে
কালিতলা ঘাট থেকে যমুনা পারি দিচ্ছি । প্রতিদিন ভোর থেকে ৩ টা ট্রলার যায় জামতৈল ঘাটে সেখান থেকে অটো বা সি এনজি দিয়ে জামালপুর শহরে যাওয়া যায়। ঘন্টা খানেক লাগে বর্ষায় । শুস্ক মৌসুমে অনেক সময় লাগে, ঘুরে ঘুরে যেতে হয় বালুচর ঘুরে। যমুনার বিভিন্ন চরে দেখা মিলে চারণ ভূমির গরু ছাগল ভেড়া মহিষের ভ্রাম্যমান খামার।

বর্ষার শেষ দিকে হিমালয় থেকে নেমে আসা বরফগলা পানির ধারায় স্রোতের প্রবাহিত যমুনা। বর্ষায় যমুনা সমুদ্রের মত দেখায় ভয়ঙ্কর সর্বনাশা যমুনা পার ভাঙনে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেয়া নদী। আবার শীতে ধু ধু মরুভূমির মত বালুচর নিয়ে বয়ে চলছে যমুনা। এই ভয়ংকর যমুনার সাথেই নদী পারের মানুষের প্রেম। যমুনার অঙ্গে যত রুপ আছে তরঙ্গে যত কথা আছে সব এই মানুষগুলি জানে। কালিতলা থেকে ট্রলার একটু চলার পরই চর ডাকাতিয়া নজরে পরলো। চর ডাকাতিয়া নিয়ে অনেক গল্প আছে এদিকে মানুষের মনে।

ট্রলার ছাড়ার পর আকাশে এক কোনে মেঘ জমেছে বাকি আকাশ পরিস্কার। মাঝ নদীতে বৃষ্টি আসলে ভালোই হতো যমুনায় সব ধরনের আবহাওয়া পেতাম। কপাল কিছুটা হলেও সুপ্রসন্ন হয়েছে। প্রায় শেষ দিকে এসে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। যমুনায় বৃষ্টিতে ট্রলার চলছে। মানুষ হয়ে জন্মাবার অনেক গুলো অসুবিধার মাঝে একটা অসুবিধা হলো আপনি মন থেকে কোন কিছু চাইলে সেটা পেলে আপনার গলা ভারি হয়ে আসবে।বৃষ্টিতে আমাদের ট্রলার চলছে এক মুর্হৃতের জন্য মনে হচ্ছে সমুদ্রে ভাসছি আমাদের কোন গন্তব্য নেই গন্তব্য ছাড়া জীবন সুন্দর। হ্যাঁ ভয়ংকর সুন্দর।
বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
ফেব্রুয়ারি ২০১৯








