বিপদে পড়িবার ভয়ে’ই মানুষ ভয় পায় বিপদের। তখন মানুষের সাহস ও বুদ্ধি দুটোই লোপ পায়। মানবজাতির ধর্মই হলো যেখানে বিপদে পড়ে সে সেখানে বার-বার যায়। গতকাল বিষখালী নদীতে বিপদে পড়ে শিক্ষা হয়নি। বরগুনা ঘুরা শেষ করে রাতে থাকবো ভেবেছিলাম। বিধিবাম না থেকে এবার ইচ্ছে হলো সকালে সূর্য্যউদয় দেখবো সাগরকন্যায়।
বুদ্ধমূর্তি
রাতে খোঁজ খবর নিয়ে বের হয়ে গেলাম। দিন রাত চিন্তা না করেই পুরাকাটা ফেরীঘাট থেকে রাতে খেয়া পার হয়ে আমতলী। সেখান থেকে রাতে কুয়াকাটা যাওয়া যায় । যেহেতু রাতেও খেয়া পারা-পার হয় তাই লোকাল কোন নদী ভাবছি। রাতে এতো কিছু খোঁজ নিলাম না আর ঘাটে এসে নদী দেখে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো এটা নাকি পায়রা নদী। বিষখালীর ভয়াবহতা কাটাতে না কাটতেই পায়রার মত ভয়ঙ্কর খরস্রোতা নদীর মুখোমুখি। যা বাংলাদেশে খুব কম আছে। এই ভয়াবহ নদী সম্পর্কে গল্প শুনেছি কয়েকদিন আগে মুরাদ ভাইয়ের কাছে। উনি নাকি একবার এই নদীতে ঝড়ের কবলে পড়েছিল। এর ভয়াবহতা এত প্রখর ছিল যেখানে তিনি কপাল জোড়ে বেঁচে গেছেন।
পায়রা নদী
প্রায় তিন কিলোমিটার নদী পারি দিতে হবে ছোট ট্রলারে। যেখানে একটা বাইক আর কয়েকজন মানুষ ছাড়া কিছু নেই। পিছনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল না সাথে সকালে সূর্য্যউদয় দেখার লোভ। দুটোই তাড়া করেছিল। অবশেষে পৃীথমদা আর আমি উঠলাম। এই ছোট জীবনের পথচলার ভয়ঙ্করতম তিন কিলোমিটারের পর যা হতে যাচ্ছে তা আঁচ করতে পেরেছি নদীর রুপ দেখে। প্রবল স্রোত আর চারদিক অন্ধকার হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেবার উপক্রম। মাঝ নদীতে যাবার পর ট্রলার আর মাঝির নিয়ন্ত্রণে থাকে না। পুরাকাটা থেকে আমতলী নদী পার হবার জন্য সোজ পথ না করে একটু বাঁকা পথ করা হয়েছে মাঝ নদীতে এসে নৌকা চলে স্রোতের গতিতে একটু মাঝনদী পার হলে আবার চেষ্টা করে আমতলীর দিকে যাওয়া শুরু হয়।
পায়রা নদী
উঁচু উঁচু ঢেউ ট্রলারে পানির ধাক্কা সবার মুখ রক্তহীন হয়ে গেছে। আমার এবার ভয় কাজ করছে না বিপদের মাঝখানে থাকলে ভয়ে কাবু করতে পারে না। সব কিছু সৃষ্টিকর্তার উপর ছেড়ে একটা বাইকের হাতলে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ধীরে-ধীরে সর্বনাশা পায়রা পাড় হয়ে আমতলীর দিকে যাচ্ছে। জীবনের সব থেকে দীর্ঘতম রাস্তা পাড়ি দিচ্ছি। অবশেষে ঘাটের দেখা পেলাম। দেখা পেলেও পেটের ভেতর যে ঘুরঘুর শুরু হয়েছিল তা শেষ হচ্ছে না। ঘোরের মাঝেই পঠুয়াখালী কুয়াকাটা মহাসড়ক থেকে বাসে উঠলাম। কখন যে কুয়াকটা নামলাম খেয়াল নেই। মাঝরাতে বাস থেকে নেমেই রাতের সমুদ্র দেখতে পেলাম।
ট্রলার
বিশাল কিছুর সামনে আসলে আমার উদাস লাগে। সেটা পাহাড়, নদী, হাওর কিংবা সাগর যাই হোক না কেন। বারবার ফোন আসছে এক বড় ভায়ের পরিচিত কয়েকজন হোটেল ঠিক করে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ইচ্ছে করছে না হোটেলে যেতে সাগারের বিশাল ঢেউ দেখে পেটের ঘুরঘুর কমে গেছে। ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে উদাস লাগছে। চোখ থেকে হুট করেই দু ফোটা নোনা জল সাগরের নোনাজলে মিশে গেল। হয়তো বেঁচে ফেরার আনন্দে! কিংবা ৬৪ জেলা শেষ করার আনন্দে। বিশাল সমুদ্রে পা ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছিল। তবু ফিরতে হলো, মানুষ হয়ে জন্মাবার অনেক সমস্যার এটাও একটা না চাইলেও ফিরতে হয়।
রাতের সমুদ্র
হোটেলে এসে দেখি কয়েকটা পিচ্চিপাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। তারা হলো হোটেল মালিকের ছেলে ভাতিজা। পরম সম্মানের সাথে হোটেলে নিয়ে গেল আমাদের ।আমি বার-বার বলি আমার শুধু ভালো মানুষের সাথে পরিচয়। কি জানি কিসের তাড়ায় আজ ক্ষুধা চলে গেছে, রাতে দুজনের কারোই খাবার খাই নি।রাতে গোসল করে বিছনায় শুতেই ঘুমের মহাসমুদ্র ডুবে গেলাম।

সাগরকন্যায় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে একটু একটু করে। একটা বাইক থাকলে কুয়াকাটার সবগুলো দর্শনীয় জায়গা দেখার সুবিধা হয়।যখন যেখানে ইচ্ছে নামা যায়। বাইক নিয়ে আপাতত দুইজন চলেছি সূর্যের ঘুম ভাঙা দেখতে। বামে ঝাউবন আর ডানে সমুদ্র মাঝে লাল কাকড়ার দৌড়াদৌড়ি দেখে সূর্যউদয় দেখার জন্য গঙগামতি এসেছি এটাই সেরা জায়গা সূর্যউদয় দেখার জন্য । শুধু সূর্যউদয় নয় শব্দ দূষণহীন নিরব সমুদ্র দেখার জন্যও এখানে আসতে হয়। বেশ মনলোভা গঙগামতির চর।
গঙগামতির চর
সৈকতের তীরে সাড়ি সাড়ি ছোট বড় মাছ ধরার ট্রলার রাখা। মাছ ধরতে যাবার জন্য ট্রলার নামানো বা মাছ ধরে ফেরার পর ট্রলার তীরে তুলা বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখার মত।
সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলার
বছর পাঁচেক আগে একবার এসেছিলাম বেশ পরিবর্তন হয়ে গেছে। পদ্মা সেতু চালু হবার পর প্রচুর ভ্রমনপিপাসু মানুষ এখন কুয়াকটা আসে।
সকালে সৈকতের কাছে প্রচুর বাইক আর ভ্যান পাওয়া যায়। সুবিধা মতো ঠিক করে নিয়ে পুরো কুয়াকটা ঘুরে দেখা যায়।
বাইকে ঘুরাঘুরি
বাইক নিয়ে এক এক করে সবগুলো টুরিস্ট স্পট ক্রমান্বয়ে ঘুরা যায়।
লাল কাকড়ার চরঃ
লাল কাকড়ার চর ভাটার সময় গর্ত থেকে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া বেরিয়ে আসে যা এলাকাটিকে লাল কার্পেটে পরিণত করে। মূলত লাল কাঁকড়া প্রচুর দৌড়াতে পারে এবং পর্যটকদের দেখলে দ্রুত গর্তে ঢুকে যায়। গর্ত থেকে বের হওয়া আর ঢুকার খেলা দেখতেই যায় পর্যটক।
লাল কাকড়ার চর
রাখাইন পল্লীঃ
রাখাইন পল্লী জনগোষ্ঠী মায়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে পালিয়ে এসে ১৮০০ শতক থেকেই এখানে তারা বসবাস করে আসছে।রাখাইন জনগোষ্ঠীর মহিলারা তাদের হাতের কারুকাজ খচিত বিভিন্ন জিনিসপত্র এখানে বিক্রয় করে থাকে। প্রায় ২০০ বছর ধরে আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন এখানে বসবাস করছে।
রাখাইন পল্লী
মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধ মন্দিরঃ
কুয়াকাটা সৈকত থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায় রাখাইনদের একটি গ্রামের নাম মিশ্রিপাড়া। এখানে রয়েছে বড় একটি বৌদ্ধ মন্দির। কথিত আছে, এ মন্দিরের ভেতরে রয়েছে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধ মূর্তি। এছাড়া এখান থেকে সামান্য দূরে আমখোলা গ্রামে রয়েছে এ অঞ্চলে রাখাইনদের সবচেয়ে বড় বসতি।
মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধ মন্দির
নৌকা জাদুঘরঃ
মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধ মন্দির সাথে নৌকা জাদুঘর। ২০১২ সালে সমুদ্র সৈকতের অব্যাহত ভাঙনে বালু ক্ষয়ের ফলে সন্ধান মেলে ৭২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থের কাঠের তৈরি একটি নৌকার। ধারণা করা হচ্ছে ২শ বছরের আগে রাখাইনরা এই নৌকায় করেই কুয়াকাটায় এসে বসতি গড়েছিল। কালের বিবর্তনে রাখাইনদের নানা স্মৃতি হারিয়ে গেলেও বর্তমানে এই নৌকাটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী বহন করছে।
নৌকা জাদুঘর
বৌদ্ধবিহারঃ
কুয়াকাটা বৌদ্ধ মন্দির প্রাচীন কুয়ার সন্নিকটে অবস্থিত। এটি প্রায় ১৫০ বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির প্রথমে মন্দিরটি ছিল কাঠের তৈরি। পরে এটি ভেঙে পাকা করা হয়। মন্দিরের ভেতরে রয়েছে ৩৭ মন ওজনের বুদ্ধমূর্তি। ৬ ফুট বেদীর উপর ৩৬ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তিটি দেখার জন্য প্রতিদিন হাজারো মানুষ এখানে ছুটে আসে। এটি উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তি।
বুদ্ধমূর্তি
কুয়াকাটা কুয়াঃ
কুয়াকাটার কুয়া বৌদ্ধবিহার এর পাশে অবস্থিত। তৎকালীন সময়ে সুপেয় পানির অভাব ছিল পানযোগ্য পানির জন্য আরাকানরা উক্ত কূপটি খনন করেন।বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করার কারণে কূপটি তার আসল জৌলুস হারিয়েছে।
কুয়াকাটা কুয়া(২০১৭)
লেবুর চরঃ
লেবুর চর স্থানীয়দের নিকট নিম্বুর চর নামে পরিচিত। এই চরে খুব সহজে মোটর সাইকেল যোগে ভ্রমণ করা যায়|
লেবুর চর
শুঁটকি পল্লীঃ
শুটকি তৈরির প্রক্রিয়া এখান থেকে হাতে-কলমে দেখতে পাওয়া যায়।লেবুর চর যাওয়ার পথে শুঁটকিপল্লী দেখতে পাওয়া যায়।
ফাতরার চরঃ
ফাতরার চর কুয়াকাটার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এটি একটি সংরক্ষিত বনভূমি।ফাতরার চর সুন্দরবনের অংশ এটি দ্বিতীয় সুন্দরবন নামে ও পরিচিত। ইঞ্জিন চালিত বোট ও মোটরসাইকেল দুটি মাধ্যমে ফাতরার চরে যাওয়া যায়।
তিন নদীর মোহনাঃ
তিন নদীর মোহনা কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ স্থান। এখানে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হলে বালি অন্যরকম রূপ ধারণ করে যা দেখার জন্য বছরের অধিকাংশ সময় পর্যটকরা এখানে ভিড় করেন।সোনাতলা নদী,শিব্বিরিয়া নদী ও আন্ধারমানিক নদীর মিলনস্থলই তিন নদীর মোহনা নামে পরিচিত।
কুয়াকাটা ছাড়াও পটুয়াখালী জেলা জুড়ে অসংখ্য দর্শনীয় জায়গা আছে। তার মাঝে একটা হলো মির্জাগঞ্জ উপজেলার মজিদবাড়িয়া শাহী জামে মসজিদ সাড়ে ৫শ বছর পূর্বে সুলতানী শাসনামলে স্থাপিত এ শাহী মসজিদটি।
ভোরে সূর্যউদয় দেখার জন্য বাইক বা ভ্যান নিয়ে বের হলে ১০ টার মাঝেই সব ঘুরে ফিরে আসা যায় হোটেলে। আমরা রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে সমুদ্র স্লানে গিয়েছিলাম। সৈকতের পাশে বেশ কিছু খাবার হোটেল আছে দেখে শুনে সামুদ্রিক মাছের স্বাদ নিতে পারেন।
সমুদ্রে গেলে আমার একটা লাইন বার বার মনে হয়।
“হে মহাসমুদ্র আমারে লও তোমার বুকে”
বিশাল কিছুর সামনে গেলেই উদাস হয়ে উঠে মনে। দুপুরের রোদে সমুদ্রে নেমে গোসল করে দিন কাটিয়ে দেয়া যায়। জোয়ার ভাটার সাথে সাথে পানি দূরে আর কাছে চলে যাওয়া মানুষের মনে মায়ার ছবি তৈরি করে। আমরা গোসল করে চেয়ার ভাড়া নিয়ে সমুদ্রের কর্মযজ্ঞ দেখছিলাম। একটা পুরো পরিবার সমুদ্রে গোসল করছে বাচ্চারা মনে হয় প্রথমবার সমুদ্রে এসেছে বাবা মা একটু দূরে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের খেলা দেখছে। বারবার নিষেধ করছে দূরে না যেতে। এই মুহূর্তে দুনিয়ার সেরা সুখী পরিবার মনে হচ্ছে এই পরিবারকে।
কয়েকটা কুকুর পুরো সৈকত জুড়ো ঘুরে ঘুরে শুকে শুকে কি জানি খায়। একটু পর কাছেই দুটো কুকুর এই কাজ করছে। কাছ থেকে দেখে বুঝলাম জেলেদের জাল থেকে পরে থাকা পঁচে যাওয়া মাছ এদের খাবার। স্থানীয় একজনের কাছে জানলাম পঁচে যাওয়া ইলিশ মাছ নাকি এদের সব থেকে প্রিয় খাবার। কি আরাম করে একটা মাছ দুই কুকুর ভাগ করে নিয়ে গেল, মানুষ হলে নিশ্চয় এরকম ভাগ হতো না!
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতো চললো রাতে আমাদের ঢাকা ফেরার বাস, পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা ফিরবো। ব্যাগ গুছিয়ে রুম থেকে আবার সৈকতে আসতে হবে সূর্যাস্ত দেখার জন্য।
বিকেল গড়াতেই পশ্চিম আকাশে একটু একটু করে সমুদ্রের বুকে হেলে পড়েছে সূর্য! সমুদ্রের বুকে যতোই হেলে পড়ছে সূর্য, ততোই আবিররঙা হয়ে উঠছে আকাশ। নিরবে সৈকতে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস ঢেউ। সেই ঢেউয়ে নেমে পা ভিজে সূর্যাস্ত দেখে মন শান্ত হয়ে গেছে। সূর্য ডুবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছে, সব দুঃখ, না পাওয়ার ক্লান্তি যেন সূর্যের সঙ্গে ডুবে যাচ্ছে। আহারে জীবন!
সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে সমুদ্রের জলে। কি বিশাল তেজ দেয়া লাল সূর্য সমুদ্রে নিজেকে সপে দিচ্ছে আহারে কি দৃশ্য। সূর্য হয়তো মনে মনে বলছে হে মহাসমুদ্র আমারে লও তোমার বুকে!



























