দুধকুমার, ফুলকুমার, বুড়িতিস্তা, নীলকমল,সোনাভরি, হলহলিয়া, তিস্তা, ধরলা, গঙ্গাধর ও ব্রম্মপুত্রের কুড়িগ্রাম
দুধকুমার, ফুলকুমার, বুড়িতিস্তা, নীলকমল,সোনাভরি, হলহলিয়া, শিয়ালদহ, ধরণী, জালছিড়া, জিঞ্জিরাম, কালজানি, তিস্তা, ধরলা, গঙ্গাধর ও ব্রম্মপুত্রের গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মনে হলো। মানুষ তার সারাজীবনে যতই আয়ুময় হোক না কেন কতটুকু দেখতে পারে? কতটুকু বুঝতে পারে? কত জায়গায় তার পদচিহ্ন রেখে যেতে পারে?
আজ থেকে হাজার কিংবা শত বছর আগে মানুষ এক বছরে পৃথিবী যতটুকু দেখতে পারতো এখন তো তার চেয়ে বেশি দেখতে পাবার কথা। যোগাযোগ ব্যাবস্থা ব্যাপক উন্নতি হওয়ার পরেও কেন জানি মনে হয় আমাদের গতির স্থবিরত্ব বরং বেড়েছে। মনে হয় আমরা গতিহীন কচ্ছপের মত হয়ে যাচ্ছি। এইসব উচ্চাঙ্গ কথা মনে হলে আমার অলস মস্তিষ্কে নিউরনের মারামারি শুরু হয়ে যায়। মাঝে মাঝে বলে বসে তুই হলি নিচু মস্তিষ্কের মানুষ তুই কেন এসব ভাববি?
জন্মেছি তো ব্রম্মপুত্রের কোল ঘেষা উপজেলায় নদীর প্রতি টান থাকবেই। আসলে এমন না যে নদীর কোল ঘেষে জন্ম হলেই কেউ নদীর প্রতি টান থাকবে। টান কিভাবে আসে আমিও জানি না।জানার ইচ্ছে জাগলেও অলস মস্তিষ্ক এড়িয়ে যায়। আমার একবার ইচ্ছে হয়েছিল বাংলার প্রতিটি নদীতে নৌকা নিয়ে ভেসে বেড়াবো,গোসল করবো। আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বেশ জুইতের তবে আকাঙ্ক্ষা মাত্র আকাঙ্ক্ষা।

গতদিন কুড়িগ্রাম এসেছি, প্রথম আলোর একটা নিউজে পড়ছিলাম কুড়িগ্রামে প্রায় অর্ধশতাদিক নদী আছে। আমার মনে হয় আর কোন জেলায় এতো নদী নাই। বাংলাদেশে ভারত থেকে যে পানি প্রবাহিত হয় তার ৭০ শতাংশ পানি কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়।
সৈয়দ শামসুল হকের নূরুলদীনের কথা মনে পড়ে যায় কবিতায় বলেছেন।
“সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপুত্রে মেশে।
নূরলদীনেরও কথা যেন সারা দেশে
পাহাড়ি ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়”
ব্রম্মপুত্র দিয়েই অধিকাংশ পানি প্রবাহ হয়। কিন্তু হায় ব্রম্মপুত্রের আজ যে বেহাল দশা। আবার যদি নূরলদীন আসতো এবার যদি ডাক দিত চলো বাহে ব্রম্মপুত্রের বুকে।
ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম বাস ও ট্রেনে আসা যায়। সকালে রংপুর এক্সপ্রেস। রাতে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস আর বাসে সকাল ও রাতে দু বেলায় চলে। আগে থেকে ঠিক করে না আসায় বাসে আসতে হয়ছে কুড়িগ্রাম।
ফজরের আজানের সুরের সাথে আলো ফোটার মূর্হতে কুড়িগ্রাম এসে পৌঁছেছি। বাংলাদেশের প্রায় জায়গায় ফ্রেশ হবার জন্য এখনো মসজিদ আমার কাছে সেরা জায়গা। বাস থেকে নেমে ফ্রেশ হয়ে পেঠ ঠান্ডা করে পথে নামলাম। কুড়িগ্রাম শহরটা আগে একটু ঘুরে নিতে চাই আবহাওয়া যতক্ষণ শীতল থাকে শহরে ভ্যানে ঘুরে নিচ্ছিলাম।
উত্তরের প্রতিটি শহর শান্ত একটা মোলায়েম ভাব আছে। সকাল বেলা যাত্রি কম থাকায় আমাদের ভ্যানের পাইলট সাব বেশ আরাম মত আমাদের ঘুরাচ্ছেন। কোথায় কি দেখাচ্ছেন। পাকা দাঁড়ি পাঞ্জাবী টুপি তে মানিয়েছে ভালো। ফজরের নামাজ পড়েই পথে নেমেছেন রুটি রুজি করতে । “আল্লাহ্ পাক ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত রুটি রুজি করতে দিয়েছেন তাই ফজর নামাজ পড়েই নামি’ বললেন চাচা।
বেলা বাড়ছে সাথে খিদাও। হালকা কিছু খেয়ে আমাদের দিনের প্রথম গন্তব্য ফুলবাড়ী উপজলা। শহর থেকে বাস যায় ধরলা ব্রীজ হয়ে ফুলবাড়ী ঘন্টাখানেক পথ। ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়িতে আমাদের গন্তব্য। পথে বেশ কিছু মৃত প্রায় নদী দেখলাম।

ফুলবাড়ী পৌছে আমাদের যাত্রা নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি ফুলবাড়ী থেকে ভ্যান মিনিট বিশেকের পথ জমিদার বাড়িটি।


তাদের জমিদারী ছিল বর্তমান কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার বিদ্যাবাগিশ, শিমুলবাড়ী, তালুক শিমুলবাড়ি সহ আরো অনেক এলাকা। এছাড়াও তাদের পাঙ্গা নামক এলাকায় আরেকটি জমিদারী ছিল। যা শিবপ্রসাদ বক্সী নামের একজন দেখাশোনা করতেন। জমিদার বিশ্বেশ্বর প্রসাদ বক্সীর দুই ভাই ভারতের কোচবিহার রাজ্যে একটি বাড়ি ক্রয় করে সেখানে তাদের বাবা জমিদার প্রমদরঞ্জন বক্সীকে নিয়ে চলে যান। শুধু শেষ জমিদার বিশ্বেশ্বর প্রসাদ বক্সী জমিদারী প্রতা বিলুপ্তী হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে ছিলেন এবং জমিদারী পরিচালনা করেছেন। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলেও তিনিও ভাইদের কাছে ভারতে চলে যান। আর এইভাবেই এই জমিদার বংশের জমিদারীর ইতি ঘটে।

জমিদার বাড়ির পাশে রয়েছে ত্রিশ ফুট উঁচু শিব মন্দির। এখনও অনেক সনাতন ধর্মের মানুষ শিব মন্দিরে আসেন পূজা অর্চনা করতে। এছাড়া, জমিদার বাড়ির ভেতরে রয়েছে একটি দুর্গা মন্দির। একসময়ের জৌলুসময় জমিদার বাড়ি এখন বিলুপ্তির পথে। ইট-চুন-সুড়কি দিয়ে নির্মিত এই জমিদার বাড়ির পশ্চিম দিকের দোতলা ভবন ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া বেশিরভাগ দালানেরই ছাদ অবশিষ্ট নেই।শত বছরের পুরোনো এ স্থাপনাকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠছে কিছু অপ্রয়োজনীয় গাছ। তাই সংস্কার আর সংরক্ষণের অভাবে ফুলবাড়ীর মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি নামে এ প্রাচীন স্থাপনা ।

নাওডাঙ্গা থেকে বের হয়ে আবার কুড়িগ্রাম ফিরে আসছি রাতে উলিপুর উপজেলা ডাকবাংলোতে থাকার কথা। কাল উলিপুর হয়ে ব্রম্মপুত্রের বুকে ভেসে বেড়ানোর কথা মুলত হিমু পরিবহণ থেকে দুইদিন পর উলিপুর একটা মেডিক্যাল ক্যাম্প করবো অগ্রবর্তী টিম হিসেবে সেটার জায়গা তৈরি করা প্রসশান অনুমতি নেয়ার কাজে এবার আসা।

উলিপুর আমাদের স্থানীয় ভলেনটিয়ারদের সাথে দেখা। অফিসিয়াল কাজ সেরে ডাকবাংলো তে গেলাম।চারদিকে বেশ গাছগাছালি বাঁশঝার মাঝখানে সদ্য নির্মাণ করা দু তলা ভবন। জঙ্গলে আগছাগুলো কাঁটা উঁচিয়ে দাত-নখ বাগিয়ে মুখিয়ে আছে। যে কোন মুহূর্তে কাউকে আক্রমন করবে। তবে বাংলোটা বেশ, নতুন হওয়াতে বেশ রাজকীয় একটা ব্যাপার চলে আসছে। ক্লান্ত হওয়াতে রাতে খাবার দাবার শেষ করে দ্রুতই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। মাঝ রাতে ডাহুক পাখির ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙলো। একটু রাগ হলো এই ঘুম ভাঙাতে। পরক্ষনেই আবার মন খারাপ হতে থাকলো মনে হচ্ছে মাঝরাতে কাউকে না পাওয়ার বেদনায় ডাহুক বুকফাটা আর্তনাদ করে যাচ্ছে। পাখিও কি মানুষের মত দুঃখ পায় তার পছন্দের সঙ্গীকে না পেলে। তারো মন ভাঙ্গে মাঝরাতে গলা ধরে আসে বুকফাটা আর্তনাদে। দুরু আমি কি যে চিন্তা করি কখন হুদাই, ওয়াশ রুম থেকে ফিরে আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমের দিকে যাচ্ছি। ডাক বাংলোর ওয়াশরুম গুলো এতো বড় হয় এরকম সুনসান এলকায় এসব ওয়াশরুমে গেলে ভয় খাওয়া শুরু হয়।
জানালার পর্দা মেলে দিতে ভুলে গিয়েছিলাম ভোরের আলো চোখে লাগার সাথেই ঘুম ভাঙলো।বাংলোর চত্তরে বেরু করতে বের হয়েছি আমি আর ইমাম ভাই একটু পর যোগ দিলেন মিল্টন ভাই। অসংখ্য পাখি আর দূর থেকে ভেসে আসা মোরগের ডাকে সকাল শুরু।। দিনটা ভালো হোক এই আশায় গুছগাছ করে বেরিয়ে যাচ্ছি সারাদিনের জন্য একটা নৌকা ঠিক করা আছে। আজ সারাদিন ব্রম্মপুত্রে ভেসে বেড়াবো।বাংলাদেশে ব্রম্মপুত্র প্রবেশের জায়গাটায় যাবার অনেক দিনের শখ ছিল।

ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি হিমালয় পর্বতমালার কৈলাস শৃঙ্গের নিকট জিমা ইয়ংজং হিমবাহে।যা তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।জাঙপো নামে তিব্বতে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে এটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে যখন এর নাম হয়ে যায় শিয়াং বা সিয়ং। তারপর আসামের উপর দিয়ে দিহাং নামে বয়ে যাবার সময় এতে দিবং লোহিত নামে আরো দুটি বড় নদী যোগ দেয় এবং তখন সমতলে এসে চওড়া হয়ে এর নাম হয় ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মপুত্র হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গের নিকটে মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে তিব্বত ও আসামের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের কাছে ব্রহ্মপুত্র দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজারের দক্ষিণে মেঘনায় পড়েছে।

১৭৮৭ সালে ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ এর তলদেশ উত্থিত হওয়ার কারণে এর দিক পরিবর্তিত হয়ে যায়। ১৭৮৭ সালের আগে এটি ময়মনসিংহের উপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে বয়ে যেত। পরবর্তীতে এর নতুন শাখা নদীর সৃষ্টি হয়, যা যমুনা নামে পরিচিত
আমি বার বার বলি আমার শুধু ভালো মানুষের সাথে পরিচয়।কুড়িগ্রামের স্থানীয় ভলানটিয়ারদের জন্য সবকিছু সহজে হয়ে যাচ্ছে। নৌকার যাবার আগে শুনলাম পাশেই একটা জমিদার বাড়ি আছে।শুনে লোভ সামলাতে না পেরে সবাই সহো চলে গেলাম জমিদার বাড়িতে। উলিপুর মুন্সি বাড়ি, সদর থেকে অটো তে মিনেট পনেরর পথ, যে কোন যানবাহনকে বললে নিয়ে যাবে বাড়িটিতে।

বাড়িটি আঠারো শতকে বিনোদী লালের পালক ছেলে শ্রী ব্রজেন্দ্র লাল মুন্সির তত্ত্বাবধানে চমৎকার স্থাপত্যের এই মুন্সিবাড়ী নির্মিত হয়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, কাশিম বাজার এস্টেটের সপ্তম জমিদার কৃষ্ণনাথ নন্দী একটি খুনের মামলায় আদালতের কক্ষে দাঁড়ানো অসম্মানজনক বিবেচনা করে ৩১ অক্টোবর ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তার বাসভবনে আত্মহত্যা করেছিলেন। জমিদার কৃষ্ণনাথ নন্দীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী মহারাণী স্বর্ণময়ী কাশিম বাজার এস্টেটের জমিদার হন। স্বর্ণময়ী একজন শিক্ষিত এবং জমিদারপন্থী ছিলেন।মহারাণী স্বর্ণময়ী দেবীর অধীনে হিসাব রক্ষকের কাজ করতো বিনোদী লাল নামের এক মুনসেফ বা মুন্সি।

কথিত আছে, একদিন বিনোদী লাল মুন্সি হাতির পিঠে চরে শিকার করতে গিয়ে একটি ব্যাঙের সাপ ধরে খাওয়ার দৃশ্য দেখতে পান। আগেকার দিনে মানুষেরা বিশ্বাস করতেন যে স্থানে ব্যাঙ সাপকে ধরে খায় সেই স্থানে বাড়ী করলে অনেক ধন সম্পত্তির মালিক হওয়া যায়। তাই বিনোদী লাল মহারাণী স্বর্ণময়ী কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এই স্থানে একটি বাড়ী নির্মাণ করেন। বাড়িটি নিয়ে বিভিন্ন গুজব রয়েছে।অনেকে বাড়িটিকে বনোয়ারি মুন্সিবাড়ি বলে থাকেন। এর কারণ হিসেবে বিশ্বাস করা হয় যে বনোয়ারি নামে এক কৃষক এই বাড়িতে থাকতেন।

মোঘল আমলের স্থাপনার সাথে বিট্রিশ আদলের সমন্বয়ে বিভিন্ন কারুকার্যের অপরুপ সৌন্দর্য বাড়ী নির্মাণ করা হয়।
সেই অট্টালিকা প্রথম তলায় তিনটি বড় কক্ষ রয়েছে। বাড়ীটির একটি কক্ষে রক্ষিত ব্রজেন্দ্র লাল মুন্সির প্রতিকৃতি ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল ভেবে বাড়িটিতে আক্রমণ করে। আর পাক হানাদার বাহিনী এ কক্ষে রক্ষিত ছবিটি বেয়নেট দিয়ে নষ্ট করে। যা আজও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে দৃশ্যমান।

ব্রজেন্দ্র লাল মুন্সির স্ত্রী আশালতা মুন্সি দুই কন্যা সন্তান জন্ম দেন। বড় মেয়ে সুচি রাণী (টিটু) আর ছোট মেয়ে সুস্মান কান্তি (বুড়ি) ছিল। সুস্মান কান্তি (বুড়ি) কম বয়সেই মারা যান। টিটু বড় হওয়ার পরে মুন্সি ভাবলেন, আমি ধরণীবাড়ী, বেগমগঞ্জ, মুঘলবাসা, গাইবান্ধা ও মালিবাড়ীর বাড়ীওয়ালা তবে আমার বাড়ি ভালো না হলে আমি আমার মেয়েকে ভালো ঘরে বিয়ে করাতে পারব না।
এই কথা ভেবে যখন দ্বিতল অট্রালিকা তৈরি হয়েছিল। তিনি কলকাতায় তাঁর মেয়েকে দুর্দান্ত আড়ম্বরের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। তখন থেকে অনেক বছর কেটে গেছে। ব্রজেন্দ্র লাল মুন্সি ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। তার কোনও ছেলে সন্তান ছিল না।তাঁর স্ত্রী আশালতা মুন্সি বিহরিলাল নামে একজন ছেলে সন্তানকে দত্যক নেন।

পরে আশালতা মুন্সি মারা গেলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুন্সিলালের বংশধররা কলকাতায় চলে গেলে মামলা মোকদ্দমার কারণে বেশ কয়েকবার বাড়ীর মালিকানা বদল হয়। বর্তমানে উলিপুর মুন্সিবাড়ী বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে নিবন্ধিত আছে। আর মূল ভবনের দুইটি কক্ষ বিগত বহু বছর ধরনীবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এখনও মূল ভবনের দরজার উপরে ধরণীবাড়ী ভূমি অফিসের সাইনবোর্ড দেয়া আছে। পরবর্তীতে ভূমি অফিসটি মুুন্সিবাড়ীর উঠানে সদ্য নির্মিত নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এই সব পুরোনো জমিদাড় বাড়ি আসলে আমার কেমন জানি ভ্রম হয়। মনে হয় এই বুঝি জমিদার গোত্রীয় কেউ বের হয়ে আমাদের বলবে এই গরিবের দল তোরা আমার বাড়ির সামনে কি করিস? আসলে বই পত্র সিনেমায় জমিদার চরিত্র দেখে মাথায় এখন কাজ করে জমিদার মানে অত্যচার করে।

এবার ব্রম্মপুত্রে ভেসে বেড়ানোর পালা মুন্সি বাড়ী থেকে সোজা ঘাটে।ঘাট বলতে একটা বাজারের সড়ক রক্ষা বাঁধ থেকে আমাদের নৌকায় উঠা মনে হয় কদম তলা নাম ছিল বাজারের।

নৌকায় উঠে চোখ কপালে বিশাল বড় নৌকা নিয়ে এসেছে আমাদের এই এলাকার ভায়েরা। মালবাহী নৌকা ২০০ মন ওজন নেয়ার মত। ছাদ খোলা মৌসুমে ধান টানার জন্য ব্যবহার হয়।বর্ষায় মাছ ধরা সহ বহু কাজ হয় এটা দিয়ে।

আমাদের গন্তব্য সাহেবের আলগা চরে সেখানে আগামি কাল একটা মেডিক্যাল ক্যাম্প করব। দীর্ঘ যাত্রা নৌ পথে। চর থেকে একটু সামনে গেলেই বাংলাদেশের অন্তিম সীমানা ব্রম্মপুত্রের বাংলাদেশে প্রবেশের জায়গা। নৌকা চলা শুরু করলো আমাদের। নৌকাতে উঠার সময় বাধ্যযন্ত্র নিয়ে উঠা হয়েছে গানাবাজনা হবে পথে। চেয়ার দেয়া হয়েছে নৌকায় ।রাজকীয় একটা ব্যাপার এসেছে উঠে শুনলাম এইটা সাহেবের আলগার চেয়ারম্যানের নৌকা আমাদের জন্য পাঠানো হয়েছে। আমি বড় হয়েছি গ্রামে, লুঙ্গিতে আমার আরাম। দীর্ঘ যাত্রা নৌকা তাই আরাম করে লুঙ্গি পরে নিলাম।এর আরেকটা কারন হলো রোদের ত্যাজ আজ একটু বেশিই। ভাদ্র মাসের তালপাকা গরম। নৌকা চালাতে বাতাস লাগছে। লুঙ্গী তে আরাম পাচ্ছি।

নৌকার খোলা অংশে বসে আছি।নৌকা চলছে ব্রম্মপুত্রের অথৈ জলের উপর দিয়ে। মাঝে মাঝে নদীতে পানির ঘুরপাক খাচ্ছে। যেন ঘূর্ণি আছে সেখানে। বেগে ঘুরছে পানি। আচ্ছা এই ঘূর্ণিতে যদি মাছ পরে তাহলে কি হবে। মাছেরা কি করে সারাদিন রাত এই পানিতে।মাঝে মাঝে আপসোস হয় সাড়ি সাড়ি অহেতুক ঘুরে বেড়ানো মাছের জীবন কেন জানা হলো না আমার। কেন জানা হলো না কোথা হতে আসে নৌকা কোথা চলে যায়। আহারে জীবনে কিছুই জানলাম না।

হুট করে নৌকার গতি কমে গেছে চরের উপর দিয়ে যাচ্ছি ব্রম্মপুত্রে প্রচুর চর জাগছে । চরে চোখ পড়লে ব্রম্মপুত্রের মন মাতানো সৌন্দর্য, বালিচরে কাশবন, কাশবনে অসংখ্য পাখির খুনসুটি। ঝাউ এর ঝাড়ে সদ্য পাতা ডাহুকের সংসার। শুক্লাপক্কের শেষ আর কৃষ্ণপক্ষের প্রথমদিনগুলো চরে আকাশ থেকে পরী নেমে আসে চাঁদের তীব্র জোছনায়। বালিগুলো পরীদের ডানায় থাকা হীরাখচিত পালকের আলো দেয়।নেচে গেয়ে বেড়ায় মৃদু বাতাসে। আহ শহুরে মৃত হাওয়ার বদলে এখানে বুকের ভেতর টাটকা হাওয়া ভরা একটি মুক্ত স্বচ্ছ প্রকৃতি পরে আছে সবার অগুচরে।শহুরে যান্ত্রিক কোলাহল মুক্ত নৈসর্গিক পরিবেশ।

যে চরে আটকে আছি সেটার নাম জানি না কাশবনে পূর্ণ মাঝে মাঝে হালকা নীল ছোট ছোট ঘাসফুল,প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। একটুখানী মধুর আশায়। এতো ছোট ফুল খুব কম দেখা যায়। মনে হচ্ছে ছোট্ট পুতুলের নাকফুলের মত তিলফুল। বর্ষায় পুরো চর নাক ভাসিয়ে জেগে থাকে অনেক পথ আসলাম বাদাম ছাড়া তেমন কোন শষ্য চোখে পড়ে নি।তেমন কোন ফসল হয় না এদিকে হয়তো।

চর ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছি দুপুরে ঘরিয়ে যাচ্ছে রোদের ত্যাজে সবাই ক্লান্ত। শুনেছি চিলমারি থেকে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড় দেখা যায়। আমরা ব্রম্মপুত্রের একদম বক্ষদেশে আছি। একটু সামনেই সাহেবের আলগা চর, বাম দিকে সোজা চলে গেলে ভারত। আমরা যতদূর যাওয়া যায় যাচ্ছি। কি আজব এক নিয়ম একটু পরেই আর যেতো পারবো না। আমাদের মাঝি সর্তক করছে যাওয়া নিষেধ সামনেই বিজিবির ক্যাম্প কিংবা বিজিবির পাহাড়া বোট ঘুরো বেড়াচ্ছে নদী জুড়ে।

একটু দূরেই মানচিত্র ভাগ হয়ে গেছে। দুটো আলাদা দেশ হয়ে গেছে।আমরা মানুষেরা দাবী করি এই নদী আমাদের ঐ নদী আমাদের কিন্তু আসলে নদী কারো নয়।নদী নিজের নিজের স্ব মহিমায় বয়ে চলে। মাঝির ফেরত যাওয়া শুরু সাহেবের আলগা চরে এসে চেয়ারম্যানে মেম্বার সাথে দেখা করে সব কিছু দেখে শুনে ফেরত যাবো দুপুরে খাবার জন্য এক বিশেষ মানুষের বাড়িতে এসেছি তিনি জগন্নাথ বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে ইংরেজী তে অর্নাস মাস্টার্স শেষ করে সরকারি চাকরি পেয়েও সেটা ছেড়ে ফিরে এসেছেন। চরে খুলেছেন একটা স্কুল চরের ছেলে মেয়েদের শিক্ষা দেন। নুন আনতে পানতা ফুরায় তবু মানুষটার কি বড় হৃদয়। আমি বার বার বলি আমার শুধু ভালো মানুষের সাথে পরিচয়।

সন্ধ্যা নামছে আমরা ফিরছি।পৃথিবী ঢেকে যাবে অন্ধাকারে।নৌকায় বসে মাথা নামিয়ে উঁকিঝঁকি দিয়ে চারদিকে দেখছি কি অনন্য সৃষ্টি সাগর সাদৃশ্য প্রকৃতি। চারদিক শুন্য কোথাও কেউ নেই, শুধু আকাশ- পৃথিবী জোড়া দুপুরটা ঝিম মেরে গেছে।মাঝে মাঝে গরম শ্বাস ছেড়ে জানান দিচ্ছে রোদের ত্যাজ। যতদূর নজর চলে বিশাল শূন্যতা আর কিছু নেই। মানুষ নেই রবি শ্যসের মাঠ নেই ধুলোটে রঙের কাঁটাঝোপ নেই। আকাশের দিকে তাক করে অশ্বথ গাছ নেই। দিগন্তরেখায় আকাশের রং আর শূন্যতা মিশে একাকার হয়ে গেছে। মানুষ বড় একা মানুষ বড্ড একা।
