আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ

Rafa Noman
ক্রমে রোদ পড়ে আসছে ।হালকা বাতাসের দোল খেয়ে  কাছের একটা ঝোপ থেকে দু’একটা প্রজাপতি উড়ে গেল। হলুদ রং এর সোঁদালি ফুলের ঝাড় থেকে। কয়েকটা পাখি কুইকুই করে ডানা মেলে উঁড়ে যাচ্ছে ঝোপ এর উপর দিয়ে আর শত বিরহ নিয়ে ডাকছে  বউ কথা – কও বউ কথা -কও পাখি।
ঠিক তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে চারদিকে । পাশেই উত্তপ্ত মাঠে শীতল ছাঁয়া পড়ছে দিনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে। যেমন ধূসর ডানা উড়ায়ে কোন অজ্ঞাত পথিক ফিরে যায় উর্ধ্বলোকে। কি হতো যদি ভ্রমান্ডের নিয়ম তুচ্ছ করে  লুসিফারের মত বিরাটাকার শুভ্র ডানা উড়িয়ে  আমি ঊর্ধ্বলোকে ফিরে যেতে পারতাম।তখন আমারো তো পাখির মত জীবন হতো!

সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনার তালিকা কত রকমের যে হয়। প্রার্থনার তো কোন রং হয়না এটাকে অনুভব করতে হয়।বিচরণ করতে হয় খোদার মহিমায়। আর প্রার্থনাকে ধারণ করতে কেউ নামাজ পড়ে, পূজো করে। কেউবা যায় পেগোডায় কিংবা গৌতমের মত ধ্যান মগ্ন হয়ে, কেউ পায় সন্ন্যাস। কেউ জালালুদ্দিন রুমির মত চায় খোদা পাগল জীবন। কিন্তু আমি বার-বার চাই একটা পাখির জীবন !

                                                                                            আলপনা গ্রাম ছবি প্রতিদিনের বাংলাদেশ থেকে নেয়া

এমনি এক ধূসর সন্ধ্যায় পোস্তদানা মনের ডানা উড়াতে উড়াতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাচ্ছি সদ্য শীতের কনকনে বাতাস বয়ে যাওয়া আমের রাজধানী খ্যাত এই অঞ্চলে। আম বাগানগুলোতে চলছে মুকুল আসার প্রস্তুতি। উপযুক্ত মাটি ও আবহাওয়া পেয়ে দারুন সব আম বাগান গড়ে উঠেছে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টরে। মোঘল আমল থেকে এইসব আমের চাষ হয় এখানে। জৈষ্ঠ্যমাস থেকে আমের মৌসুম শুরু হয়।  আমার কাছে মনে হয় পৃথিবীর একমাত্র সুন্দরী ও সুস্বাদু ফল আম।

 

                                                                                                                        বাংলাদেশে স্বাগতম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনেক ঐতিহ্যর সাথে কাঁসা পিতল শিল্প যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এটা চাপাইনবাবগঞ্জের গর্ব ছিল একসময়। এখন অবশ্য হারিয়ে যাচ্ছে এই শিল্প, মেলামাইন আর স্টিলের ভীড়ে।

 

                                                                                                                                তামা শিল্প

 

উত্তরবঙ্গের প্রতিটি গ্রাম সুন্দর। তার উপর বরেন্দ্রভূমি প্রতিটি গ্রামের স্নিগ্ধ মাটির ভাঁজে ভাঁজে আছে। তিন দিকেই ভারতের সীমান্ত ঘেরা জেলা নবাবগঞ্জ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামটি সাম্প্রতিকালে জেলাবাসীর দাবির মুখে ২০০১ সালের ১লা আগস্ট সরকারিভাবে নবাবগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাখা হয়। পূর্বে এই এলাকা ‘নবাবগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কে জানা যায়, প্রাক-ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চল ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবদের বিহারভূমি এবং এর অবস্থান ছিল বর্তমান সদর উপজেলার দাউদপুর মৌজায়। নবাবরা তাঁদের পাত্র-মিত্র ও পরিষদ নিয়ে এখানে শিকার করতে আসতেন বলে এ স্থানের নাম হয় নবাবগঞ্জ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামের ভিন্ন মত নবাব আমলে মহেশপুর গ্রামে চম্পাবতী মতান্তরে ‘চম্পারানী বা চম্পাবাঈ’ নামে এক সুন্দরী বাঈজী বাস করতেন। তাঁর নৃত্যের খ্যাতি আশেপাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি নবাবের প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠেন। তাঁর নামানুসারে এই জায়গার নাম ‘চাঁপাই”ছিল।

আবার এ অঞ্চলে রাজা লখিন্দরের বাসভূমি ছিল। লখিন্দরের রাজধানীর নাম ছিল চম্পক। চম্পক নাম থেকেই চাঁপাই।  চাঁপাইকে বেহুলার শ্বশুরবাড়ি চম্পকনগর বলে স্থির করেছেন এবং মত দিয়েছেন যে, চম্পক নাম থেকেই চাঁপাই নামের উৎপত্তি হয়েছে । ভিন্ন ভিন্ন মত নিয়ে এ নাম চলছে। আমরাও চলছি চাপাইয়ের পথে।

রাত্রি ৮.৩০ টা নাগাদ পৌঁছালাম চাপাই শহরে ।

বিদ্যুৎ ছাড়া যেন ঘুমোট অন্ধকারের এক রাজ্যে।ঘুটঘুটে অন্ধকারেই পৌঁছাইলাম এই শহরে । চাপাই শহর মহানন্দা নদীর তীর ঘেষে। সদূর  হিমালয় পর্বতমালা থেকে দার্জিলিং জলপাইগুড়ি হয়ে  এসেছে এদিকে । পদ্মা মেঘনা গোমতির মত খরস্রোতা নয় ভরা বর্ষায় ও প্রশান্ত ও স্নিগ্ধ এ নদী মহানন্দা। এখানকার মানুষের সাথে দারুন ঋদ্ধতা। বেশ প্রাচীন নদী মহাভারতেও এর অস্তিত্ব পাওয়া যায় নন্দা নামে। মহানন্দার দানে দু’পারে পলিয়ময় সুজলা সুফলা জেলা চাপাইনবাবগঞ্জ।

রাতে শহরেই থাকবো মহানন্দা মোড় এর আশেপাশে অনেকগুলো হোটেল আছে খোঁজ নিয়ে থাকা যায়। এখন আমের মৌসুম না হওয়া হোটেল গুলোতে খুব বেশি  চাপ নেই ধরদাম করে উঠে যেতে পারেন।  আমরা ধরদাম করে একটা মোটামুটি মানের রুমে উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম কলাই রুটি খুঁজতে।

চাপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত খাবার কলাই রুটি। কলাই রুটির  আদি উৎস চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মার চরাঞ্চল। স্থানীয় ভাষায় একে বলে দিয়াঢ়। পদ্মার পলি মাটি মাষকলাই চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। সম্ভবত এ কারণে ‘কলাই রুটি’ ছিল পদ্মার চরের মানুষের সকালের লাহারি (নাস্তা)। পুরুষরা ভোরে মাঠের কাজে গেলে বধূরা কলাই রুটি লাহারি কাপড়ে মুড়িয়ে পরম যত্নে মাঠে নিয়ে যেতেন। কলাই রুটির কারণে অন্য অঞ্চলের মানুষরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষদের রসিকতা করে  কলাই  সম্বোধন করতেন। কালক্রমে  কলাই রুটি চর থেকে শহরের ফুটপাত হয়ে অভিজাত রেস্তোরাঁয় ঠাঁই নিয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের যে কোনো উৎসবের প্রিয় খাবার এখন কলাই রুটি।

                                                                                                                                কলাই রুটি

হোটেল থেকে বের হয়েছি কলাই রুটি আর বেগুন ভর্তার খুঁজে। শীত শেষ হয়ে গেলেও রাতে একটু প্রভাবকাটানোর চেষ্টা করে শীতবাবু। খুব বেশি খুঁজতে হলো না মহানন্দা মোড়ের একপাশে পেয়ে গেলাম এক মাঝ বয়সি চাচাকে। উচু মাটির ভিটের উপর  চারদিক খোলা মাথার উপর পাটকাঠির ছাদ দেয়া একটা ছোট ঘরে মাটির চুলোই মাটির কড়ায়ে রুটি বাজছে। সামনে স্কুলের বেঞ্চের মত একটা হাইবেঞ্চ আর লো বেঞ্চ।বসে গেলাম আমি আর মাফুজ ভাই।  মাফুজ ভাই সহজ করল মানুষ আমার উত্তরবঙ্গের সঙ্গী।

                                                                                                                               কলাই রুটি

চুলোর পাশ ঘেষে বসে আগুনের তাপ নিতে ভালোই লাগছিল। তখনি চাচা আমাদের কিছু না বলেই দুটি প্লেটে রুটি আর বেগুন ভর্তা নিয়ে হাজির। সাথে মরিচ ভর্তা। কলাই রুটির সাথে বেগুন ভর্তা ও শুকনো মরিচ ভাঁজা দিয়ে কি যে জুইতের খাবার। না খেলে এর ফিল পাবেন না। ইদানিং অবশ্য বাহারি রকমের ভর্তা হাঁসের মাংস বেশ জনপ্রিয় হয়েছে তবে বেগুন ভর্তাই আদি খাবার এই রুটির সাথে। খেয়ে দেয়ে চাচার সাথে গল্প করতে বসছি। পরেরদিন সোনা মসজিদ কিভাবে যাব, গল্পের ফাঁকে জেনে নিলাম। গুগুল থেকে স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে সহজ ভাবে এই তথ্যের ব্যাখা পাওয়া যায়।

পরদিন সকালে আমাদের যাত্রা কানসাট হয়ে সোনা মসজিদ। চাপাই থেকে প্রায় ঘন্টা খানেকের পথ।তাই সকাল-সকাল বের হয়ে গেলাম। শহর থেকে লোকাল বাস যায়। আমরা প্রথম বাসে উঠলাম কানসাট পর্যন্ত। কানসাট নেমে আবার সেখান থেকে সোনা মসজিদ যাবো।

আম বাগানের ঠিক মাঝখানে দিয়ে রাস্তাটি যাওয়ার কারনে দু’পাশেই ভাল করে দেখা যায়। প্রথম আম বাগান থেকে পরেরটা আরো বড় বাগান মনে হয়ছে । সব বাগানেই কাজ চলছে। আগাছা নির্মুলের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। এই অঞ্চলের সবথেকে বড় আমের হাট কানসাট।আমের মৌসুমেই আসলে বেশি ভালো লাগে।এখনো মন্দ না তবুও বলেনা মানুষের জীবনের আপসোসের শেষ নেই। তারপর আমরা যাচ্ছি সোনা মসজিদ বন্দরের রোডে। যেখানে একটু পর-পর ভারতীয় পণ্য পরিবাহী বিশালগাড়ি গাড়ি পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে

মাঝে মাঝে কাঁচা সর্ষে ক্ষেত আর মৌরী গাছের মাথা দোলানো দেখতে মন্দ লাগছে না। ৭ টার দিকে কানসাট পৌছালাম। আমের মৌসুম না হওয়ায় একদমই জৌলুস নেই।  তাই বেশি দেরী না করে চলে যাচ্ছি শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে।

আজকের ঘুরাঘুরির সবগুলো স্পট শাহবাজ পুর ইউনিয়নে পাশাপাশি ভ্যানে করে যাওয়া সম্ভব। চাপাই নবাবগঞ্জের বেশিরভাগ টুরিস্ট স্পট গুলো একই এলকায়  সোনা মসজিদ স্থল বন্ধর এলাকায়।

সোনামসজিদ স্থল বন্দর দিয়ে শুরু করা আমাদের দিন। সোনামসজিদ বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য একটি স্থল বন্দর। এ স্থল বন্দর দিয়ে সারা বছরই ফল, কয়লা, পাথর, মসলা ও কৃষি পণ্য প্রভৃতি আমদানী হয়। এতে করে বন্দর অঞ্চলে গড়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার। এ বাজারে ব্যবসা বাণিজ্যের অবস্থানও সবসময় রমরমা থাকে। ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনায় কেন্দ্র হিসেবে স্থানীয়ভাবে কিছু হাটবাজারও রয়েছে। বর্তমানে এই স্থল বন্দরটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থল বন্দর।

সোনা মসজিদ স্থল বন্দর
                                                                                                                  সোনা মসজিদ স্থল বন্দর

বন্দর থেকে কাছেই খনিয়া দিঘি মসজিদ

 

খনিয়াদিঘি মসজিদ
                                                                                                                        খনিয়াদিঘি মসজিদ

 

খনিয়াদিঘি মসজিদ  বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদ গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি মসজিদ। অনেকে খঞ্জন দিঘি মসজিদ নামেই পরিচিত। খনিয়াদীঘি মসজিদ স্থানীয়ভাবে চামচিকা মসজিদ এবং রাজবিবি মসজিদ নামেও পরিচিত। ১৪৫০ থেকে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি গৌড় ছিল তৎকালীন বাংলার রাজধানী। এ সময়ই এ মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। এই মসজিদের পাশে বিশাল এক দিঘি রয়েছে যার নাম খনিয়া দিঘী। খনিয়াদিঘি মসজিদে টেরাকোটার কাজের পাশাপাশি ইটের নকশাই অধিক চোখে পরে। এ এলাকার অন্য সব মসজিদের মতো এ মসজিদেও পিলারের অংশে ও কার্নিশ বরাবর পাথরের ব্যবহার চোখে পরে। মূল কক্ষে বিশালাকায় একটিই গম্বুজ। এই ধরণের বিশালাকায় গম্বুজের মসজিদ আমদের দেশে হাতে গোনা কয়েকটি।

খনিয়া দিঘি

খনিয়া দিঘি

খনিয়াদীঘি মসজিদ থেকে হাঁটাপথ দারাস বাড়ি মসজিদ
দারাসবাড়ি মসজিদ
                                                                                                                          দারাসবাড়ি মসজিদ

ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের সময় মুনশী এলাহী বখশ কর্তৃক আবিস্কৃত একটি আরবী শিলালিপি অনুযায়ী  ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে (হিজরী ৮৮৪) সুলতান শামস উদ্দীন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে তাঁরই আদেশক্রমে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। শুরুতে মসজিদটির নাম ছিল ফিরোজপুর মসজিদ কিন্তু ১৫০৪ সালে দারাসবাড়ি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর মানুষের মুখে মুখে দারাসবাড়ি মসজিদ নামটি পরিচিত হয়ে উঠে। টেরাকোটা ইট দিয়ে তৈরি দারাসবাড়ি মসজিদটির সাথে ভারতের চামচিকা মসজিদের অনেক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।

কারুকার্য
মসজিদে মোট ৯টি কারুকার্যময় মেহরাব রয়েছে। আর মসজিদটির উত্তর দিকে রয়েছে প্রায় ৬০ বিঘা আয়তনের একটি বিশাল দিঘী। ঐতিহাসিক দারাসবাড়ি মসজিদ থেকে প্রাপ্ত তোগরা অক্ষরে উৎকীর্ণ ইউসুফি শাহী লিপিটি বর্তমানে কলকাতা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
কারুকার্য
                                                                                                                               কারুকার্য

 

দারাস বাড়ি মসজিদ থেকে অল্প দুরত্ব তাহাখানা মসজিদ

 

তাহাখানা
                                                                                                                                   তাহাখানা

প্রতিটি মসজিদে পাশে ফুল বাগেন ভরপুর।শাহ সুজার তাহখানা ৪০০ বছর আগের তাপনিয়ন্ত্রণ ইমারত  মোগল তাহখানা। শাহ সুজার তাহাখানাটি একটি তিনতলা-বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদ। গৌড়-লখনৌতির পিরোজপুর এলাকায় একটি বড় পুকুরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত ভবন কাঠামোটি ঐতিহ্যগতভাবে তহাখানা নামে পরিচিত।

তাহাখানা
বঙ্গ সুলতান শাহ সুজা তার মুরশিদ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহর উদ্দেশ্যে শীতকালীন বসবাসের জন্য ফিরোজপুরে তাপনিয়ন্ত্রণ ইমারত হিসেবে এ ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। সময়ে সময়ে শাহ সুজাও এখানে এসে বাস করতেন।
হযরত সৈয়দ শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ)
                                                                                                  হযরত সৈয়দ শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) এর জীবনী

বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা বাংলার সুবাদার থাকাকালে ১৬৩৯-১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে মতান্তে ১৬৩৯-১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে তার মুরশিদ হজরত শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহর প্রতি ভক্তি নিদর্শনের উদ্দেশ্যে তাপনিয়ন্ত্রিত ইমারত হিসেবে তাহাখানা নির্মাণ করেন।জনশ্রুতি আছে, শাহ সুজা যখন ফিরোজপুরে শাহ নেয়ামতউল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসতেন তখন ওই ইমারতের মধ্যবর্তী সুপ্রশস্ত কামরাটিতে বাস করতেন।

                                                                                                                                    বুখারী

তাহাখানা কমপ্লেক্সের ভেতরে নাম না জানা অনেক সমাধি দেখা যায়। যাদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তবে এদেরকে হজরত শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহর খাদেম বা সহচর বলে ধারণা করা হয়।গৌড়ের মতো সুপ্রাচীন স্থাপত্যকর্ম  তাহাখানা ছাড়া অন্যত্র তেমন দেখতে পাওয়া যায় না।তাহাখানা মসজিদ কে তিন গম্বুজ মসজিদ বলা হয়

 

তিন গম্বুজ বা তাহাখানা মসজিদ
                                                                                                              তিন গম্বুজ বা তাহাখানা মসজিদ
শিবগঞ্জ উপজেলা ফিরোজপুরস্থিত শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) প্রতিষ্ঠিত তদীয় সমাধি সংশ্লিষ্ট তিন গম্বুজ মসজিদটি মোঘল যুগের একটি বিশিষ্ট কীর্তি। এতে ৩টি প্রবেশ পথ এবং ভেতরে ৩টি মেহরাব রয়েছে।
আমাদের পরের যাত্রা ছোট সোনা মসজিদ যার নাম অনুসারে এই এলকা পরিচিত। স্থল বন্ধরটিও এর নামে অনুসারে। চাপাইনবাবগঞ্জ – স্থল বন্দর মূল রাস্তার পাশেই। তোহাখানা মসজিদের কাছেই এখানকার সবগুলো মসজিদ কিংবা দর্শনীয় স্থান কাছাকাছি সব।
ছোট সোনামসজিদ

 

ছোট সোনা মসজিদ সুলতানি স্থাপত্য। ছোট সোনা মসজিদের প্রধান প্রবেশপথের ওপরে স্থাপিত শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ সালের মধ্যে সুলতান হুসাইন শাহর শাসনকালে জনৈক মনসুর ওয়ালী মুহম্মদ বিন আলী ছোট সোনা মসজিদটি নির্মাণ করেন।

                                                                                                                  বালিয়া দিঘী বা বালা দিঘী
প্রচলিত আছে, একসময় মসজিদের গম্বুজগুলো সোনা দিয়ে মোড়ানো ছিল। সে কারণেই এটি সোনা মসজিদ নামে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে ভারতে আয়তনে বড় আরেকটি সোনা মসজিদ থাকায় এটি সবার কাছে ছোট সোনা মসজিদ নামে পরিচিত হয়ে উঠে।

সোনা মসজিদে গ্রানাইটের টালি ব্যবহৃত হয়েছে। সুলতানি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ছোট সোনা মসজিদে ইটের তৈরি ১২টি গম্বুজ রয়েছে।

 

গণ কবর
                                                                                                                                      গণ কবর

সোনা মসজিদেরন প্রাঙ্গণেই শুয়ে আছেন আমাদের বীর সন্তান বীর শ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।

 

বীর শ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর
মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন। পাকিস্তানের (তখন পশ্চিম পাকিস্তান) কারাকোরামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি সহ চারজন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তানের শিয়ালকোট থেকে ভারতে যান। পরে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে ৭ নম্বর সেক্টরের মেহেদীপুর সাবসেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আওতাধীন এলাকা ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, কলাবাড়ী, সোবরা, কানসাট ও বারঘরিয়া এলাকা। মেহেদীপুর সাবসেক্টর এলাকায় পাকিস্তানিদের কাছে তিনি মূর্তিমান এক আতঙ্ক ছিলেন। ১৪ ডিসেম্বরে এক সম্মুখ যুদ্ধে তিনি শহীদ হয়।
  
ডিগ্রী কলেজ

ছোট সোনা মসজিদ ঘুরেতে চাইলে সহজেই  কানসাট হয়ে নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের টিকোইলে আলপনা গ্রামে যেতে পারেন। সোনামসজিদ বাজারে দুপুরে খেয়ে নিতে পারেন।বাহারি খাবার না থাকলেও অনেক ড্রাইভার খাওয়া দাওয়া করে বলে বেশ কিছু ভালো হোটেল হয়েছে।ভালো হোটেল বলতে খাবারের মান ভালো।একটা জিনিস শিখলাম ট্রাক ড্রাইভার’রা যে হোটেলে খায় সে হোটেলের রান্না খুবিই সুস্বাদু হয়।

দুপুরের খাবার খেয়ে আমারা টিকোইল যাচ্ছি।অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক টিকোইল। খাতা-কলমে টিকোইল হলেও লোকমুখে আলপনা গ্রাম নামেই পরিচিত।

                                                                                                        ছবি প্রতিদিনের বাংলাদেশ থেকে নেয়া।

ধারণা করা হয়, আলপনার রীতি শুরু হয়েছে বহুকাল আগে। পূজা-পার্বণে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ির দেয়ালগুলোতে সাদা রঙের ফোঁটার নিচে দাগ দিয়ে আলপনা আঁকা হতো। বিবাহযোগ্য পাত্রীর বাড়িতেও দেখা যেত নানা রঙে রাঙানো বাড়ির উঠোন-দেয়াল। সেই প্রচলন থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম অঙ্কন ধারা বজায় রেখেছে। বর্তমানে গ্রামের ছোট থেকে বুড়ো সকলেই অংশ নেয় রঙের মেলায়। গ্রামের পরিবেশের মতোই সেখানকার বাসিন্দারাও সবসময় থাকে প্রাণোচ্ছ্বল, সজীব এবং অতিথিপ্রিয়।

আলপনা গ্রামের আরেক বিশেষত্ব হলো, যেসব প্রকৃতিপ্রিয় দর্শনার্থী সেখানে যান তাদের প্রত্যেককে অনুরোধ করা হতো দাসু বর্মণের পরিদর্শন খাতায় তাদের মন্তব্য লেখার জন্য। দেশ-বিদেশের যত ভ্রমণপিপাসু ব্যক্তি সেখানে গিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের অনুভূতির রেশ রেখে গেছেন সেই খাতায়। এখন অবশ্য এতো অনুরোধ করা হয় না।

একই উপজেলায় শুড়লা গ্রামে বীর ধর্পে দাড়িয়ে আছে ৫০০ বছরের পুরোনো বিরাট এক তেতুল গাছ। নানান স্মৃতি  নিয়ে ঠিকে আছে এখনো গাছটি। আলপনা গ্রাম থেকে চাইলে ভ্যান দিয়ে যেতে পারেন ওখানে। আমরা যেতে পারি নি।রাজশাহী যাবো বলে।

                                                                                                              ৫০০ বছরের পুরোনো তেতুল গাছ
সকাল সকাল শুরু করতে পারলে একদিনেই সবগুলো জায়গায় যাওয়া সম্ভব ।  আমরা চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজাশাহী শহরে চলে যাচ্ছি আজ। তাই এদিকে দেরী না করে দ্রুত রাজশাহীর বাস ধরলাম।

আমার কোথাও গেলে সেখান থেকে কয়েকদিন না থেকে যেতে মন চায় না। তবু যেতে হয় এই তল্লাটে এসেছি কয়েকদিনে বেশ কিছু জায়গায় যাবো। ফাঁকা রোডে বাস চলছে বেশ গতিতে। এমন অন্ধাকার রোডে বাস জার্নি বেশ লাগে আমার।তখন আকাশ পাতাল চিন্তা করতে ভালো লাগে।যেন আমি এক রাজা আমার পিছনে শাঁই শাঁই করে চলছে জনমানবহীন এক রাজ্য।।

বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন

ফেব্রুয়ারি ২০১৯

{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.singularReviewCountLabel }}
{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.pluralReviewCountLabel }}
{{ options.labels.newReviewButton }}
{{ userData.canReview.message }}

Hi, I'm Saiful Islam

Welcome to my world of exploration! I’m a passionate travel blogger from Bangladesh, dedicated to showcasing the incredible beauty and rich culture of my homeland.

Find us on Facebook