বনবিবির সাতক্ষীরা
“আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে
থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবে বলে”
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই কবিতার লাইনটা আমাকে খুব টানে যতবার মানুষের কাছে যাই ততবার টানে। দুনিয়ায় কত কিসিমের মানুষ তাদের ভিতরে কত শত রং! মানুষের ভেতর কি আসলেই কুকুর থাকে? আমি খুঁজার চেষ্টা করি। খুঁজে পাই আবার পাই না, আমার কাছে মনে হয় দুনিয়ায় সব মানুষই ভালো। সবার-ই ভালো দিক আছে শুধু আমরা দেখতে পাইনা বা সুযোগের অভাবে সে ভালো দিকটা বের হয়ে আসেনা।

আমি বার বার বলি আমার শুধু ভালো মানুষের সাথে পরিচয় হয়। খুলনা এসেছি দুই দিন হলো খুলনা মানেই হিমু পরিবহণের গগণ ভাই। উনার বাসায় উঠেছি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আবাসিক এলাকা এই বাসা থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছি এই অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা। আদর আপ্যায়নে এখান থেকে বের হতে ইচ্ছে করে না। তবু আজকে খুলনা থেকে সাতক্ষীরা যাচ্ছি।
সুন্দরবন ঘেষা জেলা সাতক্ষীরা। প্রচুর নোনতা পানি আশেপাশে। এই অঞ্চলে প্রচুর চিংড়ির ঘের, চিংড়ি দিয়ে রান্না নারিকেল ঝোলে ডুবানো এই দিকে প্রচুর জনপ্রিয়।

ঢাকা থেকে সরাসরি সাতক্ষীরা বাসে কিংবা ট্রেনে খুলনা এসে খুলনা থেকে লোকাল বাসে আসতে পারেন সাতক্ষীরা। খুলনা থেকে ফজরের পর রওনা দিলে এক ঘন্টা থেকে একটু বেশি সময়ে পৌছে যাবেন সাতক্ষীরা শহরে। নাস্তা সেরে বের হয়ে যেতে পারেন সাতক্ষীরার পথে প্রান্তে। সাতক্ষীরা সদরের বাস টার্মিনাল, পলাশপোল ও খুলনা রোড মোড়ে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল আছে চাইলে রাতে থেকে কয়েক দিনে সুন্দরবন কিংবা আশেপাশে আরো ঘুরতে পারেন।

বাস টার্মিনাল থেকে ভ্যান নিয়ে আমাদের প্রথম যাত্রা জোড়া শিব মন্দির। সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে ছয়ঘরিয়ার এই শিব মন্দির অবস্থিত।
সাতক্ষীরা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ভ্যানে যাওয়া যায় ছয়ঘরিয়া জোড়া শিবমন্দির, নানা বৈচিত্র্যের টেরাকোটা ইটে নির্মিত। ১২২০ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ মন্দির দুটো নির্মাণ করেছিলেন ফকিরচাঁদ ঘোষ । মন্দির দুটোর বিশেষত্ব হলো এর গায়ের টেরাকোটাগুলো বৈচিত্র্যময় । ফুল, লতা-পাতা, বাদক, অশ্বারোহী, দেবদেবী, হসিত্মরোহী ইত্যাদি চিত্রের এ টেরাকোটার কারণে পর্যটকরা ছুটে আসেন এখানে । বর্তমানে মন্দির দুটো পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে, তবে কমতি নেই দর্শনার্থীর । সাতক্ষীরা জেলায় যতগুলো টেরাকোটা শিল্প আছে তার মধ্যে বেশ ভালো টেরাকোটার কাজ এই ‘ছয়ঘরিয়া জোড়া শিব মন্দির।

ঝাউডাঙ্গা ছয়ঘরিয়া শিব মন্দির থেকে কাছেই মাধবকাঠি বাজার। বাজার থেকে আমাদের পরের যাত্রা সোনাবাড়িয়া মঠবাড়ি মন্দির। মূলত মন্দির টি কলোরোয়া উপজেলায় তবে মাধবকাঠি বাজার থেকে ভেতর দিয়ে দ্রুত যাওয়া যায়। মাধবকাঠি বাজার থেকে বাইক ভাড়া নিয়ে মিনেট বিশেক সময়ে চলে যাওয়া যায় মঠবাড়ি মন্দিরে। কিংবা সময় থাকলে ভ্যান নিয়ে যেতে পারেন।

কলারোয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদ সোনাবাড়িয়া। ২শ’ বছর আগের গোটা সোনাবাড়িয়াজুড়ে জমিদার শাসনের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। বাংলা ১২০৮ সালে রাণী রাশমণি এই মঠ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া মঠ মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে অনেক জনশ্রুতি আছে। সোনাবাড়িয়ার এক বেলগাছ তলায় রাতের আঁধারে মাটি ফুঁড়ে বের হয় একাধিক শিব মূর্তি। রানী রাশমনি স্বপ্নে আদিষ্ঠ হয়ে স্নানের সময় ভাসমান পাথরের শিবমূর্তি উদ্ধার করে এ মঠ মন্দির নির্মাণ করেন। আম, কাঠাঁল, নারিকেল, মেহগনি, সেগুন ও দেবদারু গাছের বাগান দিয়ে ঘেরা বিশাল এক জমির ওপর অবস্থিত।

মন্দিরের পুকুরের পাশ দিয়ে ঢুকতেই ছিল বড় তোরণ। তার ওপর ছিল নহবতখানা। প্রবীণদের কাছ থেকে এ মঠ মন্দির সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে বৌদ্ধধর্ম প্রচারকালে গৌতম বুদ্ধের অনুসারীরা এখানে মঠ মন্দির তৈরি করে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসারে সুবিধা করতে না পেরে বুদ্ধের অনুসারীরা সোনাবাড়িয়া ত্যাগ করে। এরপর মঠ মন্দিরটি কিছুকাল পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে। পরে মঠ মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এটিকে মন্দিরে রূপান্তরিত করে। সংস্কারের অভাবে মন্দির টি প্রায় পরিত্যাক্ত।
আমি সবসময় বলি ঘুরতে বের হলে খুব ভোর বের হতে হবে আমরা সকাল ১০ টার মধ্যেই সোনাবাড়িয়া থেকে সাতক্ষীরা সদরে ফিরে এসেছি। সাতক্ষীরা বিখ্যাত দুধের ঘোল ও ঐতিহ্যবাহী পোড়া সন্দেশ খেয়ে শহর ঘুরতে পারেন। কিংবা যদি থাকেন তাহলে শহরের পাশে পঞ্চমন্দির,সুলতানপুর শাহী মসজিদ,মন্টু মিয়ার বাগান বাড়ি ঘুরে আসতে পারেন। সাতক্ষীরা সদর থেকে আমাদের পরের যাত্রা দেবহাটা উপজেলা। সদর উপজেলা থেকে সি এনজি বা লোকাল বাসে দেবহাটা যাওয়া যায় মিনেট ত্রিশেকের পথ দেবহাটা। দেবহাটায় আমাদের প্রথম যাত্রা বনবিবির বটতলা।

অতিকায় ছাতার আকৃতি নিয়েছে বিশাল বটগাছ লম্বা ডাল থেকে নামা ঝুল মাটিতে গেঁথে জন্ম দিয়েছে নতুন গাছের। প্রায় চার একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মূল মহীরুহ ঘিরে তৈরি হয়েছে জীবন্ত গাছের খুঁটি। সব মিলিয়ে ডাল-পাতায় ছাওয়া বিশালকার রূপ নিয়েছে বটগাছটি।

ডালে ডালে যার আগাছা-পরগাছার বসবাস। মাঝখানে রীতিমতো একটা খেজুর গাছই দঁড়িয়ে গেছে ঝুলের ওপর। বনজীবীদের বিশ্বাস, সুন্দরবনের রক্ষক বনবিবির সঙ্গে ওতোপ্রোত সম্পর্ক আছে এই বিশাল বট গাছের। এটার পাতায় পাতায় মিশে আছেন বনবিবি।
তিনি বনজীবীদের কাছে স্বমহিমায় পূজিত লোকজ দেবী।
বনবিবির জহুরানামায় বলা হয়েছে, তিনি বেরাহিম নামে এক আরবদেশী’র কন্যা। বেরাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি সতীনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্তা হন। সেখানে তার গর্ভে বনবিবি ও শাহ জাঙ্গুলী জন্ম নেন। কালক্রমে তাদের শক্ত আসন তৈরি হয় সুন্দরবনের লোকজ বিশ্বাসে।

পরবর্তীতে মানুষের লোকজ বিশ্বাসে তৈরি হয় বনবিবির শক্ত ভিত। বনজীবীদের কাছে তিনি অরণ্যের দেবী রূপে পূজিতা। বনের সমস্ত সৃষ্টিতে তার মমতা মাখা। তিনি ভালোবাসেন মানুষ ও প্রকৃতিকে। তিনি সুন্দরবনের জেলে, বাউয়ালি বা কাঠুরে আর মৌয়াল বা মধু সংগ্রহকারীদের রক্ষাকর্তী। তিনি হিন্দুর বনদুর্গা বা বনদেবীর মুসলমানি রূপ। বনজীবীদের ধারণা, বাঘ ও ভূত-প্রেতের মতো অপশক্তির ওপরে কর্তৃত্ব করেন বনবিবি। তাই গভীর মনে কাঠ, গোলপাতা, মধু ও মোম সংগ্রহ বা মাছ ধরতে যাওয়ার আগে বনবিবির উদ্দেশ্যে শিরনি দেন ক্ষীর বা অন্ন।
তাকে নিয়ে মঙ্গল কাব্যের ঢংয়ে রচিত হয়েছে বনবিবির জহুরানামা নামে বিখ্যাত পুঁথিকাব্য।
সাতক্ষীরা-দেবহাটা-কালীগঞ্জ রোডের সখীপুর মোড় থেকে দেবহাটা উপজেলা পরিষদ মোড়ে নেমে আসতে হয় বনবিবির বটতলায়। দেবহাটা থেকে ভ্যানে ১০ মিনিটের পথ।
বনবিবির বটতলা থেকে বের হয়ে কাছেই দেবহাটা জমিদার বাড়ি বা টাউন শ্রীপুর।ভ্যানে করে ঘুরে আসতে পারেন। দেবহাটা জমিদার বাড়ি কে কার দ্বারা ঘোরাপত্তন তা বলা মুশকিল তবে শুনা যায় দেবহাটার গতিধার ছোট জমিদার ছিলেন বিপণ বিহারি মন্ডল এবং তার পুত্র ফণীভূষন মন্ডল ছিলেন বিখ্যাত জমিদার। সুন্দরবন কাছে হওয়ায় কিনা জানি না তবে এই অঞ্চল দিয়ে যত আগাচ্ছি সবুজের সমারোহ বাড়ছে। দেবহাটা দিয়ে ইছামতি নদী বয়ে গেছে। আমাদের পরের যাত্রা ইছামতি নদীর তীরে মিনি সুন্দরবন বা দেবহাটা ম্যানগ্রোভ বন। দেবহাটা জমিদার বাড়ি থেকে বাইক কিংবা ভ্যানে যেতে পারেন।

যেখানে মাটি আর নদীর গল্প মিশে আছে বাতাসে, সেখানে গড়ে উঠেছে সাতক্ষীরার দেবহাটার এক অনন্য প্রকৃতির জগৎ—রূপসী ম্যানগ্রোভ বন, যেটিকে সবাই ভালোবেসে ডাকে মিনি সুন্দরবন। ইছামতি নদীর ধারে, খোলামেলা আকাশের নিচে, কেওড়া, বাইন, সুন্দরী আর গোলপাতা গাছের ঘন সবুজ ছায়ায় ঢেকে আছে পুরো বনটি। হালকা বাতাসে পাতার খসখস শব্দ, দূরে পানকৌড়ির ডাক, আর নদীর গন্ধ মিলে এক অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি করে।

পায়ে হেঁটে গেলে মনে হয়, যেনো প্রকৃতি নিজেই হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে তার সবুজ গহীনে। এই বনের পাশে আছে অনামিকা লেক, যার শান্ত জলে আকাশ আর গাছের প্রতিবিম্ব কাঁপে বাতাসে। ইছামতী তীরে বসে রোদ মাখা বিকেল দেখতে দেখতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে সময়ের খেই হারিয়ে। বনের ভিতরে আছে হাঁটার ট্রেইল, যেখানে শিশির ভেজা পাতা পায়ের নিচে মুচড়ে ওঠে, আর পাখিরা স্বাগত জানায় আপন ভাষায়। নদীর ওপারেই ভারতের কর্ম ব্যস্ত ওপার বাংলার অনেক কিছু চোখে পরে নদীর এ পারে বসেই। ২০-৩০ টাকা টিকিটের বিনিময় এই মিনি সুন্দবনে ডুকতে হয়। এখান থেকে বের হয়ে আমাদের পরের যাত্রা কালীগঞ্জ উপজেলায়। সাতক্ষীরা- কালীগঞ্জ মহাসড়কে উঠে বাস কিংবা ইঞ্জিন চালিত থ্রি হুইলারে যেতে পারেন কালীগঞ্জ।


কালীগঞ্জ উপজেলা সদর কাছে প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ। উপজেলা সদরের প্রবাজপুর গ্রামে অবস্থিত এ মসজিদটি ১১০৪ হিজরির ১৯ রমজান ২ মে ১৬৯৩ খিস্টাব্দে নির্মিত। সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় তার ফৌজদার নবাব নুরুল্লাহ খাঁ এ মসজিদের নামে লাখেরাজে ৫০ বিঘা জমি দান করেন। কথিত আছে সুবাদার পারভেজ খাঁ বাদশাহর কাছ থেকে নির্দেশ পেয়ে সেনাবাহিনীর নামাজ পড়ার জন্য এটি নির্মাণ করেন। তার নামানুসারে এ গ্রামের নাম হয় প্রবাজপুর। উপজেলা সদর হতে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে ভ্যান বললেই যেতে পারেন। প্রবাজপুর থেকে বের হয়ে আমাদের শেষ গন্তব্য নালতা গ্রামে নালতা শরীফ বা খান বাহাদুর আহছান উল্লাহ (রঃ) এর মাজার।

খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ব্যাক্তি। ওফাতের পর উনার নাম অনুসারে সাতক্ষীরা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে নানান প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ বাংলাদেশের অবহেলিত-অশিক্ষিত বাঙালি মুসলমান যুবকদের মধ্যে তিনি শিক্ষা বিস্তারে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে গেছেন। তিনি তার সারাটি জীবন ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণে। বাংলাদেশের বিখ্যাত আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা এই খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ। খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ ১৮৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রথম মুসলিম প্রধান শিক্ষক। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যাক্তি যিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা বিভাগে একজন মুসলমান হিসেবে যোগ দেন এবং সহকারী ডিরেক্টর পদ পর্যন্ত অলঙ্কৃত করেন। এছাড়াও তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনেটর ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম পরীক্ষার খাতায় পরীক্ষার্থীর নাম লেখার রীতি বিলোপ করে শুধু রোল নম্বর লেখার রীতি প্রচলন করেন। এ রীতি প্রচলিত হলে পরীক্ষকদের পক্ষপাতিত্বের সুযোগ থাকে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। শিক্ষা বিস্তারে তার অসাধারণ ভূমিকার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯২৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি এক বিরাট কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ১৯৩৫ সালে সাতক্ষীরার নলতায় স্রষ্টার ইবাদত ও সৃষ্টির সেবা এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আহছানিয়া মিশন। ১৯৬৪ সালে এর শাখা প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকায়। প্রতিষ্ঠানটি আজ নিজ গুণে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। তিনি জাগতিক কাজের পাশাপাশি ইহলৌকিক কাজেও জীবনের বহু সময় ব্যয় করেছেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি কামেল পীর হিসেবে পরিচিত হন, তার সিদ্ধ জীবনের পরিচয় পেয়ে বহু মানুষ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তার বহু হিন্দু ভক্তও দেখা যায়। মাজারে একটা প্রচলন আছে কেউ সেজদা দিতে পারবে না। একজন লোক থাকে যিনি সবসময় দেখাশুনা করেন যাতে কেউ সেজদা না দিতে পারে।

১৯৬৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এই কর্মবীর সাধক ইহজগৎ ত্যাগ করেন। তাকে তার জন্মস্থান নালতায় সমাহিত করা হয়। পরে তার সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে আজকের খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ সমাধি কমপ্লেক্স বা নলতা শরীফ। প্রায় ৪০ বিঘাজমির ওপর গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্সের মধ্যে আছে মাজার, মসজিদ, অফিস, লাইব্রেরি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অতিথিশালা, পুকুর ও বেশকিছু উন্মুক্ত জায়গা। একটি উঁচুমাটির ঢিবির মতো দেখতে, যার চারদিকের ঢালে রয়েছে নজর কাড়া ফুলের বাগান। এ বাগানের শীর্ষে রয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন সমাধিসৌধ।
খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই সমাধিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ৮, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি এখানে বার্ষিক ওরস মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

কালিগঞ্জ থেকে লোকাল বাসে সাতক্ষীরা আসতে পারেন কিংবা শ্যামনগর দিয়ে সুন্দরবন ঘুরে আসতে পারেন কয়েকদিন ছুটি নিয়ে। সাতক্ষীরায় আরো কিছু জায়গা আছে সময় নিয়ে ঘুরতে পারেন মান্দার বাড়ী সমুদ্র সৈকত, কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম।
আমরা কালিগঞ্জ থেকে বাইক নিয়ে চুকনগর এসে এখান থেকে খুলনা ফিরবো। কিংবা সরাসরি সাতক্ষীরা ফিরে ঢাকা কিংবা সাতক্ষীরা থেকে খু্লনা হয়ে ট্রেনে কিংবা বাসে ঢাকা আসতে পারেন পদ্মা সেতুর বদৌলতে ৩/৪ ঘন্টায় এখন ঢাকা আসা যায়।
আমরা চুকনগর নেমে বিখ্যাত আব্বাস হোটেলে চুই ঝাল আর খাসির মাংস খেয়ে ফিরছি খুলনায় গগণ ভাইয়ের বাসায়। আব্বাস হোটেল ১৯৫০ সালে যাত্রা শুরু করে। এই অঞ্চলের সেরা খাবার বলা যায় এইখানের চুই আর খাসির মাংস। এবং সময় থাকলে চুকনগর বধ্যভূমি ঘুরে আসতে পারেন। ১৯৭১ সালে ২০ মে ১০ থেকে ১২ হাজার বাঙালী কে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা।
মানুষ হয়ে কিভাবে মানুষ হত্যা করে এই সমাধান কখনোই ভেবে পাই না। সুনীল সাহেবের কবিতায় যেমন বলেছেন,
আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে” মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত অর্থাৎ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও কিভাবে মানুষ হত্যার মতো ঘৃণ্যতম কাজ মানুষ করে ভেবে পাই না। মানুষের থেকে আজকাল কুকুরকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়!

কুকুর মানুষের ক্ষতি করে না বুঝে কিংবা অসুস্থ হলে।আর আমরা করি সুস্থ মস্তিস্কে। তবু আমি বিশ্বাস করি মানুষ সেরা মানুষ একদিন পৃথিবীকে ভালোবাসাময় করে তুলবে। মাঝে মাঝে আমারো নিরঞ্জনের মত বলতে ইচ্ছে করে “
মানুষকে এত ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি ‘মানুষ’ শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন”
বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
ডিসেম্বর ২০২০
