মাইকেল মধুসূদন এর যশোর
“আমি পড়ে যাচ্ছি না কোন অন্তর্হীন গভীর ভয়ংকর কুয়ায়! দেখবে যখন আমার মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে তুমি কেঁদো না- আমি কোথাও যাচ্ছি না আমি কেবল পৌঁছে যাচ্ছি অনন্ত প্রেমে।” তারপর সব স্বাভাবিক হবার পর যশোর বৌভাতে গেলাম নতুন বৌ নিয়ে। যাবার পথে রুমির এই কবিতাটা আমাকে খুব করে আকৃষ্ট করছিল।
মৃত্যুর শোক এখনো কাটে নি তাই আয়োজন ছোট করে চলছে। জুইতের পরিবার সাগর ভাইয়ের। বৌ-ভাতের পরদিন ডিসেম্বরের শীতের ভোরে ছাদে নতুন বৌ কে নিয়ে পরিবার সহ বিশাল আড্ডা দিয়ে যশোর ঘুরতে বের হয়ে গেলাম। আগের দিন এটা সেটা কিনতে গিয়ে শহর ঘুরা হয়েছে কয়েকবার, বেশ গুছানো শহর।
গৌড়ের ধন ও যশ হরণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের শ্রী বৃদ্ধি ঘটেছিল বলে অনেকের ধারণা। তাই হরণকৃত যশ থেকে যশোর নামের উৎপত্তি। ফারসি শব্দ যশর থেকে যশোর নামের উৎপত্তি বলে অনেকের ধারণা। ফারসি শব্দ যশর অর্থ ব্রিজ বা সাঁকো। যশোরে আসার জন্য অসংখ্য খাল, নদী-নালা পার হতে হতো। এসব খাল, নদী-নালার উপরে ছিল অসংখ্য সাঁকো। কানিংহাম তার গ্রন্থে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যশোর শহর ভৈরব নদ এর তীরে অবস্থিত। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান যশোরকে ফুলের রাজধানী বলা হয় কেননা যশোরের গদখালি থেকে বাংলাদেশের ৮০% ফুল সরবরাহ করা হয়।
ঢাকা থেকে ট্রেন বাস,কিংবা ফ্লাইটে যশোর যেতে পারেন। রাতে রওনা দিলে ভোরে পৌছে যাবেন। নাস্তা সেরে শুরু করতে পারেন ঘুরাঘুরি। আর থাকতে চাইলে শহরের নতুন ও পুরাতন বাস টার্মিনাল, কেশব লাল সড়ক,কাপড় পট্টি তে বেশ কিছু হোটেল আছে। এছাড়া সরকারি বেশ কিছু ডাক বাংলো আছে শহরে। বাস বা ট্রেন থেকে নেমে প্রথম যাত্রা গদখালী ফুলের বাজারে, কারন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই বাজার শুরু হয় বেলা উঠার আগেই শেষ। বাস টার্মিনাল থেকে বেনাপল গামী যে কোন বাসে বা সি এন জি তে গদখালী বাজারে নামতে হবে। এটা মূলত ঝিকরগাছা উপজেলায় অবস্থিত।
গদখালী এলাকাটি দেশের সবচেয়ে বড় ফুল উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলকে ‘বাংলার ফুলের রাজধানী’ বলা হয়। গদখালী ও এর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় গোলাপ, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা ইত্যাদি নানা জাতের ফুল চাষ হয়। প্রতিদিন ভোরবেলা গদখালী বাজারে বসে দেশের অন্যতম বৃহৎ ফুলের পাইকারি হাট। এখান থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুল সরবরাহ করা হয়। ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের মতো বিশেষ উপলক্ষে এই বাজারে থাকে তীব্র ভিড় ও চাহিদা। গদখালী ফুলচাষ এখন হাজার হাজার পরিবারের জীবিকার উৎস।
গদখালীর ফুলের বাগানগুলো প্রকৃতির অপরূপ রঙে ভরপুর এক স্বপ্নপুরীর মতো। বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠজুড়ে সারি সারি রঙিন ফুলের গাছ যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। লাল, হলুদ, কমলা, সাদা, বেগুনি—নানান রঙের ফুলগুলো সকালবেলার কুয়াশা ভেদ করে ফুটে ওঠে একে একে, আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে স্নিগ্ধ সুবাস। হালকা বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের সারি দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই নৃত্য করছে। কৃষকদের পরিশ্রম আর প্রকৃতির আশীর্বাদ মিলে গড়ে উঠেছে এমন এক ফুলবাগান, যা চোখে দেখলে হৃদয়ে শান্তি মেলে। গদখালী শুধু অর্থনীতির নয়, প্রকৃতির সৌন্দর্যের এক অপূর্ব উৎসও বটে। এছাড়াও যশোরের এই অঞ্চলে প্রচুর খেজুর গাছ আছে খেজুরের রস ও খেজুরের গুড় সারাদেশে খুবই জনপ্রিয়।
গদখালী থেকে বেনাপল বন্দর ৪০ মিনেটের পথ। এটা মূলত যশোর রোড। লোকাল বাস বা সি এন জি তে যেতে পারেন পথে বিখ্যাত যশোর রোডের শতবর্ষী বৃক্ষ চোখে পড়বে। যশোর রোড হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের মধ্যে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মহাসড়ক। এই সড়কটি কলকাতার শ্যামবাজার থেকে বাংলাদেশের যশোর শহর পর্যন্ত বিস্তৃত। ব্রিটিশ ভারত সরকার এটি নির্মাণ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই পথ দিয়েই পাড়ি জমিয়েছিল ।অনেকে এ পথ ধরে হেঁটে চলার মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে হারিয়েছেন প্রাণ, পশ্চিমবঙ্গের দিকে চলে যাওয়া যশোর রোডের দু’পাশে সারিবদ্ধ হাজারো গাছ এসব ঘটনার সাক্ষী হিসেবে আজও দণ্ডায়মান হয়ে আছে। এই বৃক্ষরাজি ছায়া দিয়েছিল ঘর-বাড়িহীন লাখো মানুষকে, আশ্রয় দিয়েছিল অনেক পঙ্গু যুবক-বৃদ্ধকে, অসহায় নারী-শিশুদের। একাত্তরের সেপ্টেম্বরে যশোর রোডের এরূপ মর্মান্তিক অবস্থা চলাকালীন রোডের দু’ধার প্লাবিত হয়েছিল মৌসুমি জলবায়ুর প্রকোপে। ভাসমান মানুষকে যেন আরও একবার ভাসিয়ে দিতেই এই মহাপ্লাবনের আগমন। এই বন্যা এবং যশোর রোডের সার্বিক অবস্থা বিশ্ব গণমাধ্যমের নজরে আসে।
বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে যশোর রোডকে আন্তর্জাতিকী করণের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। একাত্তরে তিনি এসেছিলেন কলকাতা সফরে। তখন এই বন্যায় নৌ পথে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সাথে নিয়ে অ্যালেন আসেন এবং রচনা করেন সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতাটি, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যপক সাড়া দেয়। এই সড়ক ও সড়কের গাছের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ২০০ বছরের। মৌসুমি ভৌমিক অনেক বছর পর বাংলায় গেয়েছিলেন।
“কাদামাটি মাখা মানুষের দল
গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর
নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে?
কার কাছে বলি ভাত রুটি কথা
কার কাছে বলি কর কর ত্রাণ
কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও
মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ! “
যশোর রোড পেরিয়ে বেনাপল স্থলবন্দর যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বেনাপোল শহরে অবস্থিত বাংলাদেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর। এই বন্দরটি বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতের সাথে রপ্তানি-আমদানি করতে ব্যবহৃত হয়। এই বন্দরটি বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ দ্বারা পরিচালিত। আমদানিকৃত ভারতীয় পণ্যগুলির মধ্যে প্রায় ৯০% এই বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ২০০২ সালে বেনাপোল শূল্ক স্টেশন কে স্থলবন্দর ঘোষণা করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেয়া হয়। বেনাপোল স্থলবন্দরের আয়তন প্রায় ৯০ একর।
বিশাল কর্মযজ্ঞে লেগে থাকা জায়গা এই বেনাপোল বন্দর থেকে ট্রেনে ফিরতে পারেন যশোর কিংবা ঢাকা। আমরা বেনাপোল ঘুরে ১১ টার দিকে যশোর শহরে ফিরছি। একদিনে একটি জেলার বেশিরভাগ দর্শনিয় স্থান দেখতে হলে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই পথে নামতে হবে। তাহলেই কেবল দেখা সম্ভব
যশোর শহরে ফিরে বাস টার্মিনাল বা যেখানেই নামেন রিকসা পথে আমাদের পরের গন্তব্য চাঁচড়া শিব মন্দির।যশোর- বেনাপোল রোডে বাস টার্মিনাল থেকে একটু আগেই। অথবা বাস টার্মিনাল থেকে রিকসায় পাঁচ মিনিটের পথ মন্দিরটি জেলার সদরের চাঁচড়ায় অবস্থিত। এটা ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে মনোহর রায় নির্মাণ করেন। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর চাঁচড়া শিব মন্দিরকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
মন্দিরে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায়- শ্রী মনোহর রায় ১৬৯৬ খ্রিঃ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। মোঘল শাসকদের কাছে রাজা প্রতাপাদিত্যের পতনের পর তার অধিনস্ত রাজ্য যে কয়জন জমিদার ‘রাজা’ উপাধি ধারণ করে শাসন করতেন তন্মধ্যে শ্রী মনোহর রায় (১৬৪০-১৭০৫ খ্রিঃ) ছিলেন অন্যতম। কথিত আছে রাজা মনোহর তার রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে এ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। এক কালে মন্দিরের পাশেই রাজপ্রাসাদ ছিল। এখন তা শুধুই ইতিহাস। সে প্রাসাদের অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নি। মন্দিরের সামনে থেকে অটো রিকসায় মিনিট দশেকর পথ আমাদের পরের গন্তব্য যশোর কালেক্টর ভবন।
যশোর- ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা। ১৭৮৬ সালের ৪ এপ্রিল যশোর কালেক্টরেট প্রতিষ্ঠা প্রস্তাব দেন মি. টিলম্যান হেঙ্কেল। সে বছরই যশোর কালেক্টরেট এর যাত্রা শুরু মি. টিলম্যান যশোর জেলার প্রথম কালেক্টর নিযুক্ত হন। ১৮০১ সালে বর্তমান স্থানে কালেক্টরেট ভবন গড়ে তোলা হয়। ১৮৮৫ সালে বর্তমান ভবনের ১ তলা নির্মাণ করা হয়। ৩৬০ দরজার এই ভবন তৎকালীন বাংলার দীর্ঘতম ভবন।
নতুনরূপে যশোর কালেক্টরেট ভবন সাজানো হয়েছে। বর্ণিল আর্কিটেকচারাল আলোকসজ্জায় রাতে মোহনীয় রূপ ধারণ করে যশোরের ঐতিহ্যের প্রতীক এ ভবনটি। ভবন চত্বরে পার্ক ফিরে পেয়েছে প্রাণ। সবুজের মাঝে ফুলে ফুলে সুশোভিত করা হয়েছে। কালেক্টরেট ভবনের দ্বিতীয়তলায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে চোখে পড়বে অপরূপ কালেক্টরেট পুকুরটি। পুকুরপাড় বাঁধাই ও বসার ব্যবস্থা করায় শহরবাসীর পছন্দের জায়গায় পরিণত হয়েছে এটি। কালেক্টর ভবন দেখে সামনের মোড় থেকে আমাদের পরের যাত্রা যশোর আইটি পার্ক
২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উদ্বোধনের সময় সাবেউনমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোরে আন মানের একটি আইটি পার্ক স্থাপনের ঘোষণা দেন। দীর্ঘদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর ২০১৪ সালের ২৫ এপ্রিল যশোর শহরের বেজপাড়ার নাজির সংকরপুর এলাকায় এ প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। খুলনা বিভাগের তথ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং আইটি ইন্ডাস্ট্রি শক্তিশালীকরণের জন্যই প্রাথমিক ভাবে যশোরে করা হয়েছে আইটি পার্ক। বর্তমানে খুব বেশি লাভজনক না হওয়ায় আইটি পার্ককে রিসোর্টে পরিণত করার কথা ভাবছে সরকার। শহরে এই জায়গা গুলো ঘুরতে দুপর গড়িয়ে যাবে চাইলে সুবিধামত জায়গায় দুপুরের আহার করে পরের গন্তব্য যেতে পারেন। এর মধ্যে অবশ্য শহর বেশ কিছু জায়গা ঘুরা হয়ে যাবে চোখে পড়বে বাংলাদেশের বৃহত্তর সিনেমা হল মনিহার।
শহর থেকে বের হয়ে আমাদের পরের যাত্রা কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে। ঘন্টা দেড়েকের পথ । যদি দুই দিনের জন্য যান হাতে সময় থাকলে কেশবপুরে মির্জানগর হাম্মাখানা ও কেশবপুর পৌরসভায় হনুমান গ্রাম ঘুরে আসতে পারেন। আমাদের মূল গন্তব্য বাংলা সহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি। যশোর থেকে কেশবপুর এসে সেখান থেকে অটো নিয়ে আসতে পারেন দত্ত বাড়ি ও জাদুঘর।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত (২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪ – ২৯ জুন, ১৮৭৩) ছিলেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার। যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদীর তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ পরিবারে মধুসূদন দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন রাজনারায়ণ দত্ত ও তাঁর প্রথমা পত্নী জাহ্নবী দেবীর একমাত্র সন্তান। রাজনারায়ণ কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের এক খ্যাতনামা আইনজীবী ছিলেন। কবি কপোতাক্ষ কে খুবই লালন করতেন মনে। অনেক কবিতায় উল্লেখ করেছেন নদীকে।
হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করার সময় মধুসূদন প্রথম কাব্যচর্চা শুরু করেন। তাঁকে বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব মনে করা হয়। ঐতিহ্যের অনুবর্তন অগ্রাহ্য করে তিনি কাব্যে নতুন রীতি প্রবর্তন করেন। বাংলা ভাষায় তিনিই অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও চতুর্দশপদী বা সনেটের প্রবর্তক।
যৌবনে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে তিনি “মাইকেল মধুসূদন দত্ত” নাম গ্রহণ করেন এবং পাশ্চাত্য সাহিত্যের আকর্ষণে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। জীবনের দ্বিতীয় পর্বে মধুসূদন নিজের মাতৃভাষার প্রতি মনোযোগী হন। এই পর্বে তিনি বাংলায় মহাকাব্য, চতুর্দশপদী কবিতা, নাটক ও প্রহসন ইত্যাদি রচনা করেছেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি রামায়ণের উপাখ্যান অবলম্বনে অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্য।মধুসূদনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নাটকীয় ও বেদনাঘন। মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে কলকাতায় এই মহাকবির মৃত্যু হয়
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাংলা ভাষার প্রখ্যাত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর পিতা রাজানারায়ন দত্ত নির্মিত বাড়িটি কবির স্মৃতি নিদর্শন ও আলোকচিত্র নিয়ে গড়ে তুলেছে একটি জাদুঘরে । দু তলা বাড়িটির নিচ তলায় রয়েছে দত্ত পরিবারের মন্দির, মধুসূদন জাদুঘর । জাদুঘরে রয়েছে খাট, চেয়ার এবং আলমারি । পাশে রয়েছে ছোট একটি পাঠাগার । এ ভবনের উত্তরদিকে রয়েছে ছাদহীন-দেয়াল ঘেরা একটি কক্ষ । কক্ষের কোণায় রয়েছে তুলসী গাছ । দত্ত বাড়ির প্রবেশ দরজার সামনে ১৯৮৪ সালে শিল্পী বিমানেশ চন্দ্র বিশ্বাসের হাতে নির্মিত মধুসূদন দত্তের একটি ভাস্কর্য কবির স্মৃতি ধরে রেখেছে ।
মধুসূদন দত্তের বাড়ি থেকে বের হয়ে কেশবপুর থেকে চুকনগর হয়ে খুলনা ফিরবো । খুলনা ফেরার আগে চুকনগেরর কাছে এক প্রাচীন নির্দশন আছে সেখানেই আপাতত গন্তব্য।
যশোরের কেশবপুরে চুকনগরের কাছে ভরত রাজার দেউল বা ভরত ভায়না বিস্ময়কর এক প্রাচীনতম নিদর্শন। ১৮০০ বছরের পুরোনো প্রাচীন এ নিদর্শন কেশবপুর উপজেলার গৌরীঘোনা ইউনিয়নে ভদ্রা নদীর পুর্বাঞ্চল তীরে ভরত ভায়না গ্রাম নামক স্থানে দাঁড়িয়ে আছে ’ভরতের দেউল’ ভরত রাজার দেউল নামে পরিচিত। কেশবপুর শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
মোট ৮২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে গেছে। ঢিবির শীর্ষ ধাপটির দেয়াল ৯ ফুট প্রশস্ত। মূল মন্দিরের চারদিকে চারটি প্রবেশপথ আছে। এগুলোর মধ্যেও এখন পর্যন্ত সাতটি প্রকোষ্ঠ দেখা গেছে। গঠনশৈলী বিবেচনায় পূর্ব দিকটাই এর মূল প্রবেশপথ ছিল বলে ধারণা করা হয়।
এর নির্মাণে যে ইট ব্যবহার করা হয়েছে, তা বেশ বড়। এত বড় ইট এই অঞ্চলের কোনো পুরাকীর্তিতে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি। স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও গুপ্তযুগের পোড়ামাটির মাথা, পোড়ামাটির মানুষের হাত ও পায়ের কয়েকটি ভগ্ন টুকরা, কয়েকটি মাটির প্রদীপ, পাওয়া গেছে এখানে। ভদ্রা নদীর সেতু পার হয়ে কিছুদূর গেলেই ভরত ভায়না গ্রাম। অসংখ্য গাছগাছালি, বাঁশবাগান আর পাখির কলরবে মেঠো রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলেই দেউলের চূড়া নজরে পড়ে। দেউল প্রাঙ্গণে আছে বিশাল এক বটগাছ। সপ্তাহে শুক্রবার হতে শনিবার পর্যন্ত দর্শনার্থীরা টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে। রবিবার বন্ধ।
ভরত রাজার দেওল থেকে বের হয়ে চুকনগর এসে চুকনগর থেকে যশোর,খু্লনা কিংবা ঢাকায় ফিরতে পারেন। আমরা খুলনা ফিরছি। যাবার আগে চুকনগর বিখ্যাত আব্বাস হোটেলে চুই ঝাল আর খাসির মাংস খেয়ে ফিরতে পারেন।
চুকনগর থেকে খুলনার বাস ধরেছি। রাত হয়ে গেছে, গগণ ভাই অপেক্ষা করছে। উনার বাসায় উঠবো আমি আর মিল্টন, ভাই। পথে যেতে যেতে মাথায় মাইকল সাহেবের কপোতক্ষ নদ কবিতা ঘুরছে। আমার শৈশব কেটেছে নরসুন্দা নদীর তীরে। আমার শৈশবের নদী নরসুন্দা কে আমিও কবির কপোতক্ষ নদের মতই অনুভব করি । আমার বার বার জানতে মন চায় শৈশবে আর ফেরা যায় না কেন?
আমার আপসোস হয়! শৈশবের মানুষগুলো কেন ফিরে না। মানুষের মৃত্যু আমাকে আহত করে। কিন্তু জগৎ এর নিয়ম মানুষের মৃত্যুতে মানুষের কিছু যায় আসে না!
বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
নভেম্বর ২০২০





















